মায়ের কাছে সে ছিল ‘রাণী’। ছোট্ট, শান্ত, লাজুক একটা মেয়ে। চট্টগ্রামের ধলঘাটের সেই বাড়িতে মাকে ঘরের কাজে সাহায্য করত, বই পড়ত, আর স্বপ্ন দেখত। তখনও সে জানত না, একদিন তার নামটাই হয়ে উঠবে এক অসম লড়াইয়ের প্রতীক। ১৯১১ সালের ৫ মে। চট্টগ্রামের পটিয়ার ধলঘাট গ্রামে জন্ম নিল এক শিশুকন্যা, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার ছিলেন চট্টগ্রাম পৌরসভার কর্মচারী, মা প্রতিভাময়ী দেবী। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়ে ওঠা প্রীতিলতা ছোটবেলা থেকেই ছিলেন মেধাবী ও পড়াশোনায় আগ্রহী। ইতিহাসের শিক্ষিকা ঊষাদির মুখে ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাইয়ের গল্প শুনে তাঁর মনে প্রথম প্রশ্ন জেগেছিল—একজন নারীও কি দেশের জন্য লড়তে পারে? উত্তরটা তিনি খুব তাড়াতাড়িই খুঁজে পেলেন। বিপ্লবীদের গোপন বই তাঁর হাতে এল। পড়লেন ক্ষুদিরাম, বাঘাযতীন, কানাইলালের কথা। বইয়ের পাতার মানুষগুলো যেন ধীরে ধীরে তাঁর সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল। প্রীতিলতার সহপাঠী কল্পনা দত্ত তাঁর আত্মজীবনীতে লিখছেন, "আমাদের স্কুল জীবনে আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না। কিন্তু ঝাঁসির রানী ও তাঁর কর্মকান্ডের উদাহরণ আমাদের কল্পনাকে প্রজ্বলিত করেছিল। মাঝে মাঝে আমরা নিজেদেরকে নির্ভীক বলে মনে করতাম…!" তারপর ঢাকায় পড়তে গিয়ে লাঠিখেলা, ছোরা-চালানো ও আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ নিলেন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় লড়াই ছিল অন্য জায়গায়। সেই সময় বিপ্লবী সংগঠনে নারীদের জায়গা পাওয়া সহজ ছিল না। তবু তিনি থামেননি। অবশেষে এল সেই দিন। মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে বিপ্লবী দলে যুক্ত হলেন প্রীতিলতা। ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর। পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাব, যে ক্লাবের দরজায় লেখা ছিল, ‘কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ’, সেই অপমানের বিরুদ্ধে অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব পেলেন মাত্র একুশ বছরের তরুণী। সেদিন রাতে তিনি পুরুষের পোশাক পরে সহযোদ্ধাদের নিয়ে এগিয়ে গেলেন। চারদিকে অন্ধকার। সামনে ব্রিটিশ শাসনের অবরুদ্ধ ঘেরাটোপ। আর তাঁর বুকের ভিতর একটাই আগুন, অপমানের জবাব খোঁজার নিরলস প্রয়াস।
আক্রমণ শুরু হল। ক্লাবের ভিতর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু লড়াইয়ের একপর্যায়ে প্রীতিলতা গুলিবিদ্ধ হলেন। ব্রিটিশবাহিনীর কাছে কারাবন্দি হওয়া ছাড়াও আরেকটা পথ খোলা ছিল। সেই পথ মুক্তির, আলোর, বিপ্লবের মশাল ভার হাজারও নারীর হাতে তুলে দেওয়ার। দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিলেন। গলায় ঝোলানো পটাসিয়াম সায়ানাইড খুলে মুখে ঢেলে দিলেন। পাড়ি দিলেন চিরস্বাধীন হয়ে। এক অনন্ত পথে। যে পথ হাজারও পাখির ডানা মেলার ঠিকানা। যে পথ সে সন্ধান করেছিল আশৈশব। ধর্মের নামে খুন হওয়া প্রতিটা প্রাণ, তথাকথিত ‘নিচু’ বর্ণের যে নারীর পরিবার আজও বিবাহ যৌতুক বাধ্যতামূলক মনে করে, তারা প্রত্যেকে একদিন সেই পথের সন্ধান করবে, প্রীতিলতার সন্ধান করবে। স্বাধীন ভারতের ঠিকানা ওদের জন্যই রেখে গেছিল প্রীতিলতা। আকাশে-বাতাসে সেদিন নিঃসংশয়, নিঃসঙ্কোচ উড়বে প্রীতিলতার নিশান আর খাঁচা ভাঙা হাজারও পাখির ঝাঁক।