ক্যামেরা ঘুরতেই তিনি টলতে শুরু করতেন। চোখ লাল, জড়ানো গলা, হাতে বোতল; যেন নেশাই তাঁর জীবনের একমাত্র সঙ্গী। দর্শক হেসে গড়াগড়ি খেত। সিনেমা হল কাঁপত হাসির রোলে। কিন্তু শট শেষ হতেই আশ্চর্য এক দৃশ্য। বোতলটা নামিয়ে রেখে তিনি চুপচাপ এক গ্লাস জল খেতেন। পর্দার বাইরে তিনি কখনও মদ স্পর্শই করেননি। ভারতীয় সিনেমার সেই কিংবদন্তি কৌতুক অভিনেতার জীবন খানিক এমনই। ঋত্বিক ঘটকের নাগরিক চলচ্চিত্রের মধ্যে দিয়ে অভিনয় জগতে প্রবেশ। অভিনয়ের জন্য তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাতালের হাঁটা, কথা বলা, চোখের দৃষ্টি— সবকিছু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনুশীলন করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, দর্শককে হাসাতে গেলে চরিত্রটাকে সত্যি করে তুলতে হবে। অনেকেই গুলিয়ে ফেলতেন রীল আর রিয়েল। ভাবতেন, নিশ্চয়ই তিনি বাস্তবেও নেশাগ্রস্ত। শুটিং সেটে নতুন কেউ এলে লুকিয়ে লুকিয়ে তাঁকে লক্ষ্য করত। কিন্তু দুপুরের বিরতিতে তিনি চা খেতেন, সহকর্মীদের সঙ্গে গল্প করতেন, আর সন্ধ্যা নামলেই পরিবারের কাছে ফিরে যেতেন। আদ্যপান্ত মদ্যপানবিমুখ এক মানুষ। তখন বোঝা যেত, পর্দার মানুষ আর বাস্তবের মানুষের কতোটা ফারাক। তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ। রাস্তাঘাটে, স্টেশনে বা বাজারে তিনি মানুষের চলাফেরা লক্ষ করতেন। সেই ছোট ছোট অভ্যাসই পরে পর্দায় ফুটে উঠত অনাবিল দক্ষতায়। তাই তাঁর মাতালের অভিনয় কখনও অতিরঞ্জিত মনে হতো না; বরং মনে হতো, এ যেন চেনা কোনও মানুষ।
অসিত সেন প্রথমবার তাঁর ভিতরের মদ্যপ চরিত্রটির অন্বেষণ করেন। ১৯৭০ সালে অভিনয় করেন ‘মা অউর মমতা’ ছবিতে। সেখানেই প্রথমবার মাতাল চরিত্রে তাঁর ডেব্যু। পরবর্তীতে অভিনয় করেছেন হৃষিকেশ মুখার্জীর মুসাফির ছবিতে। ‘চাচা ভাতিজা’ ছবিতে কিংবদন্তী অভিনেতা ধর্মেন্দ্রর সাথে কাজ। ‘জঞ্জির’ ছবিতে কাজ করেছেন অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে। একেকটি পার্শ্বচরিত্রকেও যত্ন নিয়ে রূপদান করতেন, ফুটিয়ে তুলতেন নির্ভেজাল অভিনয় দক্ষতায়। সময়ের সঙ্গে নায়ক বদলেছে, সিনেমা বদলেছে, বদলেছে গল্প বলার ধরণ। কিন্তু তাঁর অভিনীত চরিত্র আজও দর্শকের মুখে হাসি ফোটায়। জেন-জির স্ট্যান্ড আপ কমেডির জমানায় হতে পারে খানিক অচল দশ পয়সা তিনি, তাই নতুন প্রজন্মের কাছে খানিক বিস্মৃত। হয়তো তাঁর নাম সবসময় মনে রাখে না অনেকেই, কিন্তু টলতে টলতে বলা একেকটি সংলাপ কিংবা অদ্ভুত অভিব্যক্তি বা শুধুমাত্র কর্মকান্ড দিয়ে মানুষের মুখে হাসি আঁকার অকলুষ প্রয়াস, এখনও সিনেমাপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন।