মার্চের গোড়াতেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন। সেই পূর্ব ঘোষণা মতো এদিন বিহার বিধানসভায় এনডিএ-র পরিষদীয় দল থেকে ইস্তফা দিলেন নীতীশ কুমার। এবং, বিহারে ১০ বার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া 'সুশাসনবাবু' এবার পাটলিপুত্রের কুর্সি ছেড়ে রওনা দিলেন দিল্লিতে, রাজ্যসভার দিকে।
'সুশাসনবাবু'
বিহার মানেই তখন দিনেদুপুরে গুড়ুম-গুড়ুম। ভোট মানেই ছাপ্পা আর বুথ দখল। সন্ধে নামতে-না-নামতেই সম্ভ্রম বাঁচাতে মহিলাদের ঘরে ফেরা। এবং, দুর্নীতির মহাতীর্থ হয়ে ওঠা।
তারপর?
২০০৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর পাটনায় মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসেন নীতীশ কুমার। এবং, তাঁর প্রথম ও প্রধান এজেন্ডা হয়ে ওঠে: কড়া হাতে অপরাধ দমন। এমতাবস্থায়, বিহার মানেই 'জঙ্গলরাজ', গোটা দেশের এই ধারণার মূলে কুঠারাঘাত করতে কোনও প্রচেষ্টাই বাকি রাখেননি তিনি। পরিসংখ্যান বলছে, ক্ষমতায় আসার পর ৭০ হাজার অপরাধীকে জেলে পাঠিয়েছিল নীতীশ-সরকার। এবং, ধৃতদের দোষীসাব্যস্ত করে জেলে পাঠানোর হার (কনভিকশন রেট) ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৫ শতাংশ হয়েছিল নীতীশজমানায়।
এখানেই শেষ নয়
জামিন পেয়ে বা শাস্তির মেয়াদ শেষে জেল থেকে বেরিয়ে ওই অপরাধীরা যাতে ফের 'জঙ্গলরাজ' শুরু করতে না-পারে, তারও এক অভিনব বন্দোবস্ত করেছিলেন নীতীশ। ওই অপরাধীদের নাম-ধাম-ছবি দিয়ে, তাদের অপরাধ-বৃত্তান্তের পুঙ্খানুপক্ষ তথ্য দিয়ে, একটি ওয়েবসাইট চালু করে তাঁর প্রশাসন। যাতে করে, ওই মুখ দেখলেই সবাই সর্বত্র সতর্ক থাকেন এবং কোনও নিয়োগকর্তা কোনও নিয়োগ করার আগে ওই ওয়েবসাইটে চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন।
আর মদ?
ক্ষমতায় এসে বিহারে মদ নিষিদ্ধ করেন নীতীশ কুমার। পর্যবেক্ষকরা কেউ কেউ মনে করেন, গার্হস্থ্য হিংসা, সোজা কথায় মদ খেয়ে বউ পেটানোর রীতিতে ইতি টানতে ওই 'নিষিদ্ধ'-দাওয়াই ভালোই কাজ করেছিল। তা ছাড়াও, অপরাধ তাত্ত্বিকরা বলেন, বহু ক্ষেত্রেই ধর্ষণের ঘটনায় দেখা যায় অপরাধী মদ্যপ ছিল। ওয়াকিবহাল মহল মনে করে, সে অর্থে মহিলাদের জন্য কোনও ভাতা বা কোনও ভান্ডার চালু না-করেও তাদের সিংহভাগ ভোট পায় নীতীশ ও তাঁর দল।
যদিও মদ-নিষিদ্ধকরণ নিয়ে প্রবল বিতর্কের মুখে পড়েন নীতীশ। চোলাই তথা বিষমদ খেয়ে মৃত্যুর খবর মাঝেমধ্যেই শোনা যায় বিহার থেকে। তবুও নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন নীতীশ। এবং অনুচ্চারিত বার্তা দেন: যে সব রাজ্যে মদ নিষিদ্ধ নয়, সেখানেও তো বিষমদ খেয়ে মৃত্যুর ঘটনা হামেশাই ঘটছে। প্রসঙ্গত, খবরের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে দেশের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা 'বামপন্থী' দৈনিক 'দ্য হিন্দু', গেরুয়া-ঘেঁষা নীতীশের এই পদক্ষেপকে সমর্থন করে সম্পাদকীয় বা উত্তর সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশ করে।
আরও আছে
রাজনীতির রং না-দেখে, পুলিসকে কড়া হাতে অপরাধ দমনের নির্দেশ দিয়ে বসে থাকেননি নীতীশ। জঙ্গলরাজের গভীরে গিয়ে তিনি দেখেন, অপরাধীরা যেখানে অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে অপারেশন চালাচ্ছে, সেখানে পুলিসের হাতে সেই মান্ধাতার আমলের গাদাবন্দুক। এমতাবস্থায়, পুলিসকে প্রকৃত অর্থেই সশস্ত্র করে তোলে তাঁর সরকার। এবং লক্ষণীয় যে, যোগী আদিত্যনাথের মতো 'ঠোক দো'র পথে হাঁটেনি নীতীশের সরকার। তাই, অপরাধ দমনে বিহার থেকে ভূরি-ভূরি ভুয়ো সংঘর্ষের অভিযোগও আসেনি সেভাবে।
বিহারে ভোট মানেই বাহুবলীদের দাপট, এই ধারণার মূলেও নীতীশ কুঠারাঘাত করেন নীতীশ। ভিনরাজ্যের পর্ববেক্ষকরা এখন তাই ভোটের সময়ে বলেন: বিহারকে দেখে শিখুন।