অসীম সেনঃ তখন অর্জুনের মনে একটু একটু করে গর্বের জন্ম নিচ্ছে। গুরুর সবথেকে প্রিয় শিষ্য। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর। তাঁর ছিলা থেকে নিক্ষিপ্ত তীর খুঁজে নেয় মাছির ডানা। সেদিন পূর্ণিমার চাঁদ আলো দিচ্ছিল,...
অসীম সেনঃ তখন অর্জুনের মনে একটু একটু করে গর্বের জন্ম নিচ্ছে। গুরুর সবথেকে প্রিয় শিষ্য। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর। তাঁর ছিলা থেকে নিক্ষিপ্ত তীর খুঁজে নেয় মাছির ডানা। সেদিন পূর্ণিমার চাঁদ আলো দিচ্ছিল, কৌরব ও পাণ্ডবরা দ্রোণ সহিত মৃগয়ায় গিয়েছিল হস্তিনাপুর সন্নিকৃষ্ট অরণ্যে। সঙ্গে ছিল শিকারি সারমেয়। জঙ্গলের ভিতর কিছুটা এগিয়ে গেলে , সারমেয়র সম্মুখে উপস্থিত হয় এক কিশোর। কালো পাথরের মত শরীর। কুকুরটিকে দেখেই বোঝা গিয়েছিল সেটা গৃহপালিত। কুকুরটিকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল সেই কিশোর। কিন্তু কুকুরটি অনাবশ্যক চেঁচাতে থাকে। অগত্যা ধনুক হাতে তুলে নেয় কিশোর। এক লহমায় সাত সাতটি বাণ ছুঁড়ে দেয় কুকুরটিকে লক্ষ্য করে। এক ফোঁটা রুধীর বের হয়নি কিন্তু কুকুরের মুখ যেন তীর দিয়ে সেলাই করে দিল সেই কিশোর।

ভীত সারমেয় ফিরে আসে মালিকের কাছে। দ্রোনাচার্যের বিষ্ময়ের অবধি রইল না। এতবড় ধনুর্ধর কে আছে ধরায়? তবেকি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর হিসেবে অর্জুনকে বেছে নেওয়ার সময় এখনও আসেনি। ওদিকে তখন পার্থও বুঝতে পেরেছেন বাস্তবটা। অনুযোগ করলেন গুরুর কাছে। তীরন্দাজির সব শিক্ষা তিনি শেখাননি। জঙ্গলের গভীরে দ্রোন গিয়ে দেখেন সেই কিশোরকে। চিনতে পারলেন তৎক্ষণাৎ। এ কিশোর তাঁর কাছে এসেছিলেন অস্ত্র শিক্ষার জন্য। কিন্তু ক্ষত্রিয় না হওয়ার জন্য তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন দ্রোনাচার্য। কিশোরকে পরবর্তীকালে সকলে চিনল একলব্য নামে। এরপরের গল্প আমরা প্রত্যেকেই জানি। দ্রোণাচার্যের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে , দ্রোণের মাটির মূর্তি নির্মাণ করে অস্ত্রশিক্ষা সম্পূর্ণ করেছিলেন একলব্য। গুরু দ্রোণ অর্জুনকে সর্বশ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ চেয়ে নেন গুরুদক্ষিণা হিসেবে।

প্রশ্ন একটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে, শুধু ক্ষত্রিয় না হওয়ার জন্যই কী একলব্যকে অস্ত্রশিক্ষা দেননি দ্রোণাচার্য? না কি এর পিছনেও ছিল এক রাজনীতি। একটু ব্যাখ্যা করা যাক। একলব্য ছিলেন নিষাদরাজ হিরণ্যধনুর পুত্র। সুতরাং সামাজিক প্রতিষ্ঠা তাঁর নেহাত কম ছিল না। হিরণ্যধনু সম্পর্কে যদি একটু জানা যায়, তাহলে দেখা যাবে তিনি একদিকে ছিলেন নিষাদদের রাজা, অপরদিকে তিনি ছিলেন জরাসন্ধ্রের পরম মিত্র। কে এই জরাসন্ধ্র? মগধরাজ জরাসন্ধ্র তখন ভুভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর। কংসের শ্বশুর। স্বাভাবিক ভাবেই কৃষ্ণের বিরোধী। তিনি সতের বার যাদবদের আক্রমণ করেন। যাদবরা তখন মথুরা এবং তার আশেপাশের অঞ্চলে বসবাস করত। কৃষ্ণ এবং বলরামের মত যোদ্ধা থাকা সত্ত্বেও জরাসন্ধ্রকে আটকানো সম্ভব হয়নি। আঠারবারের সময় জরাসন্ধ্র যাদবদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেবার জন্য তৈরি হয়। কৃষ্ণ তখন বাধ্য হয়ে বিশ্বকর্মার সহায়তায় রাতারাতি দ্বারকায় একটি রাজ্য স্থাপন করে সেখানে স্থানান্তরিত হন। জরাসন্ধ্র আক্রমন করতে এলে শূন্য মথুরা তাদের স্বাগত জানায়। জরাসন্ধ্রের মিত্র যবনরাজ কালিয়াবান কৃষ্ণের নাম দেন রণছোড়।

তবেকি সেই জরাসন্ধ্রের মিত্র এবং সেনাপতি হিরণ্যধনুর পুত্রকে দ্রোণাচার্য অস্ত্র শিক্ষা দেননি মাধবের নির্দেশে? এরপরেও একলব্য একজন দুর্দান্ত ধনুর্ধর হিসেবে পরিচিত হন এবং জরাসন্ধ্রের সেনাপতি হিসেবে মথুরা আক্রমণ করেন এবং যাদবদের পরাজিত করেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ তখন তাঁর সুদর্শনচক্র দিয়ে একলব্যকে বধ করেন। কে বলতে পারে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ থাকলে একলব্যের কাহিনী অন্যরকম হত কী না? এই একলব্য পরবর্তী জন্মে ধৃষ্টদ্যুম্ন রূপে জন্ম নেন এবং দ্রোণকে বধ করেন। একলব্য হতে পারতেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর। কিন্তু সে সম্মান তিনি পাননি কোনও দিনই। মহাভারতে প্রচার হল শুধুমাত্র ক্ষত্রিয় না হবার জন্য তিনি দ্রোণের কাছ থেকে অস্ত্র শিক্ষা পাননি। রাজনীতিটা থেকে গেল সকলের অন্তরালে।