অসীম সেন: জয়-বীরু সম্পর্ক যখন ঠাকুর-গব্বরে পৌঁছায়। তখন হাঁড়ি ভরা দই নেপোর জন্য তোলা থাকে। ২০২৫ এর ১৩ জুন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা ঘোষণা করে যে ইরান তার পারমাণবিক বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে।...
অসীম সেন: জয়-বীরু সম্পর্ক যখন ঠাকুর-গব্বরে পৌঁছায়। তখন হাঁড়ি ভরা দই নেপোর জন্য তোলা থাকে। ২০২৫ এর ১৩ জুন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা ঘোষণা করে যে ইরান তার পারমাণবিক বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে। পরের দিনই ইসরায়েল ইরানকে হামলা করে। আমেরিকার অঙ্গুলি হেলনের দিকে নজর যায় গোটা বিশ্বের। কয়েক দশক আগেও ইরাণ আর ইজরায়েলের সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। ধীরে ধীরে সম্পর্কে পচন ধরে। ইরানি নেতৃত্ব ইহুদিদের বিরুদ্ধে নিজেদের মতামত পোক্ত করে। হলোকস্টকে অস্বীকার করে ইসরায়েলকে ধ্বংস করার অভিপ্রায় প্রকাশ করে। এরপর কয়েক দশক ধরে ইরান অক্ষ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এই অক্ষ লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজায় হামাস, ইয়েমেনের হুথি সিরিয়ায় আসাদ সরকার এবং ইরাকের বিভিন্ন মিলিশিয়া সহ প্রক্সি গোষ্ঠীগুলির একটি আঞ্চলিক জোট। ইরানের পারমানবিক শক্তি ইজরায়েলের কাছে হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা করেন যে তাঁর কাছে ইরানের হুমকির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া আর কোনও বিকল্প নেই। অপারেশন রাইজিং লায়নের সূচনা করেন নেতানিয়াহু।

২০২৫ সালের ২২ জুন ইরানে হামলায় অবশেষে ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দেয় আমেরিকা। বর্তমানে ইরান-ইজরায়েল বিরোধিতার উত্তাপ গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে উত্তপ্ত করেছে। ইরান, ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট বন্ধ করে দিয়েছে। ইরাক এবং জর্ডান উভয়ই তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। উত্তাপ বিস্ফোরণের জায়গায় পৌঁছয়, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে হত্যা করা হয়। ইরান ২০১৫ সালে রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তিতে যা স্বীকার করেছিল তার চেয়েও বেশি এগিয়ে গেছে। প্রযুক্তিগত স্তরে পরবর্তী দফা আলোচনা জেনেভায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই ট্রাম্প ইরানকে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রত্যুত্তর দেয় ইরানও। ইরানের এই হামলার পরিণতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে,যদি হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হয়ে যায় এবং তেল বাণিজ্য ব্যাহত হয়, তাহলে তেলের দাম বৃদ্ধি ভারতের মতো তেল আমদানিকারক দেশগুলির জন্য একটি বড় ধাক্কা হতে পারে। ইতিমধ্যে যুদ্ধের মেঘ পশ্চিম এশিয়ার আকাশ ঢেকে দিয়েছে। ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধে জলের মত টাকা খরচ করছে ট্রাম্প সরকার। তবে এ আবদুল্লা মোটেও বেগানা নয়। প্রতিদিন কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচের পিছনে আমেরিকার অভিসন্ধি কী সেটাই এখন আলোচনার বিষয়। ইরানে হামলার প্রথম দিনেই আমেরিকার খরচ হয়েছে প্রায় ৭৭ কোটি ৯০ লক্ষ মার্কিন ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।ইরান নিয়ে আমেরিকার মাথাব্যথার কয়েকটা কারণ আছে। যার প্রধান কারণ হল, ইরানের পারমাণবিক সক্ষণতা, যা মধ্যপ্রাচ্যের হুমকি। যদিও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কথা বারবার অস্বীকার করেছে ইরান। এছাড়াও ইরান সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী আমেরিকা ও তার মিত্রদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইসরায়েল আমেরিকার অন্যতম প্রধান মিত্র। ফলে ইরানের ইসরায়েল-বিরোধী অবস্থান আমেরিকার রোষের বড় একটি কারণ। আমেরিকা-ইরাণের সম্পর্কের তিক্ততা শুরু হয় ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর, যখন তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে আমেরিকান কূটনীতিকদের ৪৪৪ দিন জিম্মি করে রাখা হয়েছিল। সেই থেকে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন। এক কথায় বলতে গেলে আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই, পারমাণবিক হুমকি এবং পুরাতন রাজনৈতিক শত্রুতার জন্যই আমেরিকার এই কঠোর অবস্থান। আমেরিকার এই আগ্রাসন নীতির খেসারত দিতে খরচ হতে পারে ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৯ লক্ষ কোটি টাকা।

এ আবহে পাকিস্তানের ভূমিকা কী হতে চলেছে? ইসলামিক ভ্রাতৃত্ববোধ মাথায় রেখে তেহরানের পক্ষ নিয়ে অস্ত্র ধরার কথা পাকিস্তানের। তবে কি তাই হতে চলেছে নাকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশে পারস্যের পিঠে ছুরি বসাবে ইসলামাবাদ পাক বিদেশমন্ত্রী ইশাক দারের মন্তব্যে তীব্র হচ্ছে সেই জল্পনা। আন্তর্জাতিক কূটনীতিক মহল মনে করে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সৌদির হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে পাকিস্তান। সৌদি অবশ্য পাকিস্তানের কাছে কোনও সামরিক সাহায্য চায়নি। তবে সৌদি আর পাকিস্তানের চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে ইসলামাবাদের বিবৃতি সন্দেহ জাগাচ্ছে। ইতিমধ্যেই পাকিস্তানে তেলসঙ্কট চরমে। হরমুজ এড়িয়ে বিকল্প পথে তেল আমদানি করতে রিয়াধের কাছে আর্জি জানিয়েছে পাকিস্তান। তাই এখন আপাতত ভুলতে হচ্ছে ইসলামিক ভ্রাতৃত্ববোধ। এছাড়াও আন্তর্জাতিক মুদ্রাভান্ডার থেকে ঋণ পেতে আমেরিকার হয়ে তেহরান আক্রমণই একমাত্র উপায় পাকিস্তানের কাছে। যদিও তালিবানদের বিরুদ্ধে নাকানিচোবানি খাওয়া পাক সেনার পক্ষে আরএকটা ফ্রন্ট খোলা বেশ কঠিন। শুধু তাই নয় ইরান যুদ্ধে যোগ দিলে বালোচিস্তান থেকে বাহিনী সরাতে হবে পাকিস্তানের সেনা সর্বাধিনায়ককে। সে ক্ষেত্রে বালোচিস্তান হাতছাড়া হবার সম্ভাবনা প্রবল। বালোচিস্তান হাতছাড়া হলে ইসলামাবাদের পক্ষে অস্তিত্ব রক্ষা যে কঠিন হবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তা ছাড়াও পাক জনতার চির শত্রু ইহুদীদের হয়ে ইরান আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলে সরকারের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ ঘোষণা করতে পারে ইসলামাবাদের ফৌজ। ইতিমধ্যেই খামেনেইকে হত্যা এবং পারস্যের একটি স্কুলে বোমাবর্ষণ এই দুই ঘটনাকে আমেরিকা ও ইহুদিদের আগ্রাসন মনে করে এককাট্টা হচ্ছে পশ্চিম এশিয়ার আরব দুনিয়া সহ ইসলামিক বিশ্ব। এ আবহে কী হতে চলেছে ভারতের অবস্থান? ভারত এই মুহূর্তে ভারসাম্যে বিশ্বাস রাখছে। পশ্চিম এশিয়ায় অশান্তির পরিবেশ তৈরি হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল নয়া দিল্লি। কিন্তু খামেনেই প্রসঙ্গে মুখ খোলেনি ভারত। এমনকী ভারতে আন্তর্জাতিক ফ্লিট রিভিউয়ে যোগ দিতে আসা ইরানের জাহাজকে আমেরিকান সাবমেরিন ধ্বংস করে দিলেও, সেই হামলার নিন্দা করেনি ভারত। প্রশ্ন উঠছিল, তবে কি ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকা এবং বন্ধুরাষ্ট্র ইজ়রায়েলকে খুশি করাই ভারতের প্রথম লক্ষ? কংগ্রেস ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছে ভারতের বিদেশনীতি নিয়ে। যুদ্ধ এখন ভারতেরও দোর গোড়ায়। সুতরাং ওয়েকআপ কল বুঝতে দেরি শুভ ইঙ্গিত নয়। এর মধ্যে হাজারও জল্পনা চলছে। মার্কিন তরফে দাবি দিল্লির অনুমতি নিয়েই ভারতের সমুদ্রবন্দর থেকে ইরানের বিরুদ্ধে অস্ত্র শানিয়েছে ট্রাম্পের সেনা। ২০১৬ সালে ভারত আমেরিকার মধ্যে সাক্ষরিত চুক্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে প্রয়োজনে উভয় দেশ উভয় দেশের বন্দর ব্যবহার করতে পারে। যদিও ফ্যাক্ট চেক করে মন্ত্রকের এস্ক হ্যান্ডেলে এই দাবিকে ভুয়ো বলে জানানো হয়। কিন্তু ইরানের ওই রণতরী ছিল ভারতের অতিথি। তাই না চাইলেও দায় বর্তায় ভারতের ওপরেও। তবে কি ভারত নিজের অজান্তেই যুদ্ধের পার্টি হয়ে গেল? এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধ এড়াতে চাইছে নয়া দিল্লি। ইরান, ইজরায়েল কিংবা আমেরিকা কারও শত্রুতাই ভারতের অর্থনীতির পক্ষে শুভ নয়।