বাধ, অহিংস এবং শান্তিপূর্ণ ভোট হবে বাংলায়। ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটের মুখে বার্তা দিলেন দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। এবং সেইসঙ্গে এ-ও বুঝিয়ে দিলেন, অদৃশ্য রাজনৈতিক সন্ত্রাসের চোরাস্রোত পর্যন্ত বইতে দেওয়া হবে না, বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থক-ভোটাররা বুথে গিয়ে নির্ভীক চিত্তে ভোট দিতে পারবেন। এমতাবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, বাংলার রাজনৈতিক ট্র্যাডিশন অনুযায়ী দোরগোড়ায় সাদা থান, নিঃশব্দ স্নায়বিক সন্ত্রাস আর ভোটারদের চোখ রাঙানোর দিন কি তবে শেষ?
স্পষ্ট কথা স্পষ্ট বার্তা
দুদিনের বঙ্গসফরে এসে প্রথমদিনেই কমিশননের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার। সূত্রের খবর, রাজ্যের এডিজি (আইনশৃঙ্খলা) বিনীত গোয়েলকে ভর্ৎসনা করে তিনি বলেন, "সব জানি, বসুন"। প্রসঙ্গত, রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা প্রশ্নে রুষ্ট হয়ে বিনীতের কাছে জবাবদিহি করেন জ্ঞানেশ কুমার। তখন আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলতে শুরু করেন বিনীত এবং ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে ধমক দেন নির্বাচন কমিশনার: "সব জানি, বসুন"।
সূত্রের খবর, বেশ কয়েকজন জেলা নির্বাচনী আধিরাকিক (জেলাশাসক)কে-ও ধমক দিয়ে জ্ঞানেশ কুমার বলেন, "প্রত্যেকের কাজের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট আছে। জেলাশাসক হোন বা পুলিশ কমিশনার, গাফিলতি দেখলে কারুকে রেয়াত নয়"। প্রসঙ্গত, রাজ্যের একাধিক জেলা থেকে নিত্যদিন বোমা-বারুদ উদ্ধারের খবর আসছে। খাস কলকাতার পাইকপাড়ায় বোমা বিস্ফোরণের খবরে স্তম্ভিত হয়েছে নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশ। এমতাবস্থায়, সূত্রের খবর, রাজ্যের পুলিস কর্তাদের স্পষ্ট বার্তা দিয়ে জ্ঞানেশ কুমার এদিন বলেছেন, "হয় বোমা থাকবে, না হলে আপনারা থাকবেন"।
চোখ রাঙানোর দিন শেষ?
এদিন বেলুর মঠে মূল ফটের সামনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে জ্ঞানেশ কুমার অতি সংক্ষিপ্ত যে-বার্তা দেন, তা রাজ্যের আমলা ও পুলিস কর্তাদের শিড়দাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সংবাদমাধ্যমের সামনে জ্ঞানেশ বলেন, "রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের তপোভূমিতে দাঁড়িয়ে নির্বাচন কমিশন আবারও পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি ভোটারকে বার্তা দিতে চায়, নির্বাচন হবে অহিংস (Violence Free) এবং ভয়শূন্য (Intimidation Free)"।
সাদা-থান কাপড়ে দিন শেষ?
সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, এই বার্তা যত-না রাজ্যের সাধারণ ভোটারদের উদ্দেশে, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজ্যের আমলা ও পুলিস কর্তাদের উদ্দেশে। শুধু ভোটের দিনই নয়, তার আগেও যে-অদৃশ্য সন্ত্রাস চালায় রাজনৈতিক দলগুলি, বাড়ির দোরগোড়ায় সাদা থান রেখে গিয়ে যে-স্নায়বিক চাপ তৈরি করা হয়, তা-ও যে আর বরদাস্ত করা হবে না, তা মুখে না-বলেও বুঝিয়ে দিলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। যে কারণে সোমবারের বৈঠকে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে বলতে শোনা গিয়েছে, "সব কাজের ডিজিটাল ফুট প্রিন্ট রয়েছে। কর্তব্যে অবহেলা বা অনিয়ম দেখলে, নির্বাচন-পর্ব শেষ হওয়ার পরও কমিশন পদক্ষেপ করবে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের বিরুদ্ধে"। ধর্মতলা মঞ্চ থেকে যার পাল্টা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েক বলতে শোনা যায়, "ভ্যানিশ কুমার, আজকে আমি শুনলাম, অফিসারদের থ্রেট করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে শুধু এখনই অ্যাকশন নেওয়া হবে তা নয়, মে-মাসের পরেও নাকি উনি অ্যাকশন নেবেন। সাহস থাকা ভালো, কিন্ত দুঃসাহস থাকা ভালো নয়। মে মাসের পর আপনি থাকবেন তো আপনার চেয়ারে? তারপর বাংলার অফিসারদের থ্রেট করবেন"।
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, বাংলার রাজনীতিতে বহুকালের ট্রেন্ড অনুযায়ী, বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থকদের বাড়ির দোরগোড়ায় সাদা থান কাপড় রেখে 'বিধবা' হওয়ার যে-নিঃশব্দ হুমকি দেয় শাসকদল, এবার কিন্তু তা-ও আর বরদাস্ত করা হবে না। যে কারণে, ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা বাড়ি-বাড়ি কড়া নেড়ে ভোটারদের আশ্বস্ত করছেন এবং দাগি দুষ্কৃতীর কড়া বার্তা দিতে শুরু করছেন। পর্যবেক্ষকরা মেন করছেন, একটু বেচাল দেখলেই রাজ্যের সংশ্লিষ্ট পুলিস কর্তা বা আমলাদের বিরুদ্ধে কঠোর থেকে কঠোরতম পদক্ষেপ করতে এতটুকু দ্বিধাবোধ করবে না দিল্লির নির্বাচন সদন। এবং, "ভয়শূন্য (Intimidation Free)" শব্দবন্ধের অন্তর্নিহিত বার্তা আদতে সে কথাই বলছে।