নির্বাচন কমিশন বনাম রাজ্যের শাসকদলের স্নায়ুযুদ্ধে শেষ অবধি দ্বিতীয় পক্ষই জয়ের হাসি হাসল বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
কেন?
এই তো কিছুদিন আগের কথা। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির এজলাসে গিয়ে সশরীরের সওয়াল করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবং কমিশনকে গুনে-গুনে ১০ গোল দিলেন। সুপ্রিম কোর্ট নজিরবিহীন নির্দেশ দিল। নিষ্পত্তি না-হওয়া নামের নিষ্পত্তি করবেন নিম্ন আদালতের বিচারকেরা, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা। এবং, তারই ধারাবাহিকতায় কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সব পক্ষকে নিয়ে একটি কমিটি তৈরি করলেন। শুরু হল বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের প্রশিক্ষণ। পর্যবেক্ষকরা মত, এই পুরো প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেল।
কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন বিচারকরা?
প্রত্যেক বিচারকের জন্য আলাদা আইডি তৈরি করা হয়। পাসওয়ার্ড দিয়ে সেই আডি তে লগইন করলে স্ক্রিনের বাঁ-দিকে দেখা যায় সংশ্লিষ্ট ভোটারের এনুমারেশন ফর্ম। এবং তাঁর জমা করা সমস্ত নথি। আর ডান দিকে থাকে, সংশ্লিষ্ট ভোটার সম্পর্কে বিএলও, এইআরও, ইআরও ও মাইক্রো অবজারভারদের পর্যবেক্ষণ। যাবতীয় নথি ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বিচারক তখন বিচার করবেন, সংশ্লিষ্ট ভোটারকে তিনি যোগ্য বলে বিবেচিত করছেন কি না। এবং, ওই ভোটারের নামের পাশে টিক-মার্ক দেওয়ার পর, তাঁর নিজস্ব পর্যবেক্ষণও লেখা থাকবে।
বিচারকদের কানে মন্ত্র দিচ্ছে কমিশন?
এই পরিস্থিতিতে, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির এজলাসে হাজির হয়ে কপিল সিব্বাল অভিযোগ করেন, কমিশন বিচারকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, তাই কমিশনের কথাতেই কাজ করছেন (এবং করবেন) বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা। কপিলের এই অভিযোগে সেদিন রীতিমতো বিরক্ত হন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। এবং রাজ্যের উদ্দেশে পাল্টা প্রশ্ন করেন, কমিশন প্রশিক্ষণ দেবে না তো আর কে দেবে? কপিলকে কার্যত ভর্ৎসনা করে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর ছাড়াও আরও অনেক বিষয় নিয়ে শুনানি থাকে, তাই বারবার এই নিয়ে যেন বিরক্ত না-করা হয়।
হাল ছাড়লেন কপিল, হাল ধরলেন মেনকা
কপিল সিব্বালের মতো বর্ষীয়ান আইনজীবী যখন কার্যত হাল ছেড়ে দিয়েছেন, তখন সুপ্রিম কোর্টে রাজ্যের হয়ে ব্যাট করতে নামলেন তৃণমূলের রাজ্যসভার প্রার্থী ও আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী। পশ্চিমবঙ্গের ৮ জন ভোটার তাঁদের নাম বাদ গিয়েছে বলে দাবি করে মামলা করলেন। এবং সোমবার সেই মামলা মেনশন করে গুরুস্বামী বললেন, "তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে ভোটারদের, নথিপত্র নেওয়া হয়নি ওঁদের কাছ থেকে, আগে ভোট দিয়েছিলেন ওঁরা"। মামলাটি শুনতে রাজি হলেও প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত তাঁর বিরক্তি চেপে রাখতে পারলেন না, "পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া আমাদের কি আর কিছু করার আছে, না নেই"?
অমীমাংসিত ৬০ লক্ষ
মঙ্গলবার যখন নিউটাউনে সাংবাদিক বৈঠক শুরু করেছে নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ, তখন সুপ্রিম কোর্টের জোর সওয়াল করছেন মেনকা গুরুস্বামী। এবং তাঁর সঙ্গে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও। প্রসঙ্গত, চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের ৬০ লক্ষ নামের নিষ্পত্তি করার কথা বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের। এবং নিষ্পত্তির পর যাঁরা যোগ্য ভোটার বলে বিবেচিত হবেন, তাঁদের নাম-ঠিকানা-সহ সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশিত হবে পর্যায়ক্রমে। হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির সূত্র অনুযায়ী ১০ লক্ষ নামের নিষ্পত্তি হয়েছে এখনও পর্যন্ত। তাঁদের মধ্যে যাঁরা যোগ্য ভোটার, কেন তাঁদের নাম উল্লেখ করে সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করল না কমিশন, এদিন সেই প্রশ্ন তোলেন গুরুস্বামী ও তাঁর সঙ্গে থাকা কল্যাণ। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্ট জানিয়ে দেন, "হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে যে কমিটি তৈরি হয়েছে, সেই কমিটিই এই বিষয়ে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেবে। বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের উপর আস্থা রয়েছে আমাদের, তাঁরা ভালো কাজ করছেন, তাঁদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন না। বৈধ ভোটারদের নিশ্চয় সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে"।
প্রায় একই সময়ে, কিছুটা কাকতালীয়ভাবেই, নিউটাউনের একটি হোটেলে সাংবাদিক বৈঠক করেন দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, অমীমাংসিত ৬০ লক্ষের ভোটভাগ্য কী হবে? উত্তরে জ্ঞানেশ কুমার সুকৌশলে বল ঠেলে দেন বিচারবিভাগের কোর্টে। সহজ কথায়, সুপ্রিম কোর্ট যা নির্দেশ ও নির্দেশিকা দিয়েছে, তার ভিত্তিতেই কাজ চলছে।
হাতে রইল ট্রাইবুনাল
জ্ঞানেশ কুমার তথা দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বল ঠেলে দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টে। এবং সুপ্রিম কোর্ট বল ঠেলে দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্টে, হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে তৈরি কমিটির হাতে।
দিন শেষে তাই অমীমাংসিত ৬০ লক্ষ। এবং, হাতে রইল ট্রাইবুনাল।