অসীম সেন: অন্ধকার রাত। এক ফাঁলি চাঁদ আকাশে ঝুলছে। আরব সাগরের জলে লাল আভা। সারি সারি পর্তুগীজ পালতোলা জাহাজ জ্বলছে। সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে ভেঙে পড়ছিল জাহাজের জ্বলন্ত মাস্তুল গুলি। ভেঙে পড়ছিল পর্...
অসীম সেন: অন্ধকার রাত। এক ফাঁলি চাঁদ আকাশে ঝুলছে। আরব সাগরের জলে লাল আভা। সারি সারি পর্তুগীজ পালতোলা জাহাজ জ্বলছে। সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে ভেঙে পড়ছিল জাহাজের জ্বলন্ত মাস্তুল গুলি। ভেঙে পড়ছিল পর্তুগীজ নৌশক্তির গৌরব। দূরে সমুদ্র পাড়ে উল্লালের দুর্গ। বাঁকা চাঁদের আলোয় দেখা যাচ্ছে, দুর্গের মাথায় দাঁড়িয়ে আছে এক ছায়া মূর্তি। হাতে মশাল, খোলা চুল। মশালের আলোয় দেবী দুর্গার মত লাগছে রানী আব্বাক্কা চৌতাকে। যুদ্ধ ছাড়া কোনও উপায় ছিল না রানী আব্বাক্কার। তিনি জানতেন বেঁচে থাকতে হলে, রাজ্যের প্রতিটি মানুষকে সুরক্ষিত রাখতে হলে জিততে হবে প্রতিটি যুদ্ধ। স্থানীয় জেলে, মুসলমান যোদ্ধাদের নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা। রাতের অন্ধকারে বিছের মত বড় যুদ্ধ জাহাজের পাশে ভিড়ত ডিঙি নৌকা। নৌকার রঙ মিশমিশে কালো। নৌকায় দক্ষ তীরন্দাজ। তাদের গায়েও কালো পোশাক। হঠাৎ করে চারপাশ থেকে জাহাজ লক্ষ করে ছোঁড়া হতে থাকল অগ্নিবাণ। গুলতি দিয়ে ছোড়া হল নারকেল তেলের বোমা।

সমুদ্রে রানী ছক কষেছিলেন গেরিলা যুদ্ধের। আজকের ইতিহাস বীর বলতে শেখায় মোগল কিংবা খিলজি বংশকে। আমরা ভুলে গিয়েছি, আমাদের ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে রানী আব্বাক্কার বীরগাথা। ব্রিটিশরা ভারতে পা রাখার অনেক আগেই পশ্চিম উপকূল পর্তুগিজদের দখলে ছিল। ১৫১০ সালে তারা গোয়ায় ঘাঁটি স্থাপন করে ম্যাঙ্গালোর থেকে কলিকট পর্যন্ত মশলা ব্যবসা ছিল তাদের অধীনে। গোটা উপকূল যাদের অধীনে তাদের কাছে কাঁটা হয়ে দাঁড়াল ছোট্ট রাজ্য উল্লাল। সিংহাসনে বসার সঙ্গে পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে উপকূল রক্ষার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে নিয়েছিলেন রানী আব্বাক্কা। অন্যান্য আঞ্চলিক শাসকরা যখন পর্তুগিজ পদলেহন করতে ব্যস্ত ছিল, তখন আব্বাক্কা প্রতিরোদের মশাল জ্বেলেছিলেন। ১৫৫৫ থেকে ১৫৮৮ সালের মধ্যে পর্তুগিজরা উল্লাল দখলের জন্য বারবার আক্রমণ চালিয়েছিল। রানী তাদের শুধু প্রতিহত করেননি, পরাজিত করেছিলেন। সুমুদ্র তীরবর্তী খাঁড়ি এবং জলপথ ব্যবহার করে এক দুর্ভেদ্য ব্যুহ রচনা করেছিলেন তিনি। পর্তুগিজ ইতিহাসবিদদের কাছে তিনি রাইনা দে উল্লাল নামে পরিচিত হয়েছিলেন। আব্বাক্কা কেবল একজন যোদ্ধা ছিলেন না,একজন বিচক্ষণ কূটনীতিকও ছিলেন। তিনি ধর্ম বর্ণ ছাড়িয়ে হিন্দু নেতা, মুসলিম নাবিক, জৈন বণিক এবং স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে জোট গড়ে তোলেন। আব্বাক্কা পর্তুগিজদের আরেক ভয়ঙ্কর শত্রু ক্যালিকটের জামোরিনের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলেন, যা ভারতীয় ইতিহাসের প্রাচীনতম ঔপনিবেশিক-বিরোধী নৌ জোটগুলির একটি। তুলু এবং কন্নড় ভাষায় জেলেদের দ্বারা গাওয়া গানগুলি এখনও তার বীরত্বের স্মরণ করে। ১৫৭০ সালে পর্তুগিজরা সর্বশক্তি দিয়ে উল্লাল আক্রমণ করে,এবং দখল করে।

রানী তখন পিছু হটলেও পালটা আক্রমণ করে পর্তুগিজদের হটিয়ে দেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত রানীর নিজের এক আত্মীয়ের বিশ্বাসঘাতকতায় ধরা পড়েন। জানা যায় যে জেল বন্দী অবস্থাতেও তিনি লড়াই করতে করতে মারা গিয়েছিলেন। এখনও রানীর স্মরণে প্রতিবছর উল্লালে উৎসব পালিত হয়। আব্বাক্কা ছিলেন প্রথম মহিলা কমান্ডার। ২০০৩ সালে, ভারত সরকার তাঁর সম্মানে একটি স্মারক ডাকটিকিট চালু করে। উপকূলরক্ষী বাহিনী রানীর বীরগাথা স্মরণে রেখে ২০১২ সালে একটি টহল জাহাজের নাম রাখে আইসিজিএস রানী আব্বাক্কা।