অসীম সেন: রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের এ পর্যন্ত হওয়া ছয় জন সরসঙ্ঘচালকের মধ্যে প্রত্যেকেই উচ্চবংশ জাত। কে বি হেডগেওয়ার , এম এস গোলওয়ালকর, মধুকর দত্তাত্রয় দেওরস, রাজেন্দ্র সিং, কে এস সুদর্শন এবং মোহন ভাগ...
অসীম সেন: রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের এ পর্যন্ত হওয়া ছয় জন সরসঙ্ঘচালকের মধ্যে প্রত্যেকেই উচ্চবংশ জাত। কে বি হেডগেওয়ার , এম এস গোলওয়ালকর, মধুকর দত্তাত্রয় দেওরস, রাজেন্দ্র সিং, কে এস সুদর্শন এবং মোহন ভাগবত। এঁদের মধ্যে রাজেন্দ্র সিং একমাত্র রাজপুত ঠাকুর ছিলেন, বাকিরা সকলেই ব্রাহ্মণ বংশজাত। সরাসরি কোনও নির্দেশ না থাকলেও, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবকদের অনেক মতাদর্শিক গুরু প্রাচীন শাস্ত্রে বর্ণিত অনুশাসন মেনে চলার পক্ষপাতী। তাঁদের ভাবনায় আদর্শ সমাজ গড়ে তুলতে মনু সংহিতার আদর্শ মেনে চলা বাঞ্ছনীয়।
মনু সংহিতার বিরোধিতাও রয়েছে। ১৯২৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর ড বি আর অম্বেদকর মনুস্মৃতিকে দাসত্বের সনদ বলে পুড়িয়েছিলেন। মনুস্মৃতি হলো প্রাচীন ভারতের একটি আইনসংহিতা, যা জাতি, বর্ণ ও লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক কাঠামোর ওপর জোর দেয়। মনুসংহিতা তৎকালীন সমাজের রাজনৈতিক পরিকাঠামোর ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছিল। এই গ্রন্থে একজায়গায় বলা হয়েছে যেখানে নারীরা পূজিত হন, সেখানে দেবগণ তুষ্ট হন। আরও বলা হয়েছে যে, উৎসবে স্ত্রীলোককে অলঙ্কার, বস্ত্র ও ভোজ্য দিয়ে সম্মান করতে হবে। এখানেই শেষ নয়, আরও বলা হয়েছে যে, গৌরবে মাতা সহস্র পিতারও অধিক। কিন্তু এখানেই কি শেষ? ভিন্ন শ্লোকগুলিতে নারী সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করা হয়েছে, তা আগের শ্লোকগুলির সঙ্গে মেলে না বিন্দুমাত্র। মনুই স্ত্রীলোককে স্বাধীনতা দিতে নারাজ। তিনি তাঁর শ্লোকে বলেছেন নারীকে কুমারী অবস্থায় পিতা, যৌবনে স্বামী, বার্ধক্যে পুত্র রক্ষা করে। তাঁর স্বাতন্ত্র্য সঙ্গত নয়। আরও বলা হয়েছে নারীর স্বর্গলাভ পতির সেবাতে। একদিকে মনু বলছেন নারী অশেষ শ্রদ্ধার পাত্র, অপরদিকে বলছেন, তাঁর স্বাধীনতা বলে কিছু নেই।
এবার আসা যাক সমাজের উচ্চ এবং নিম্ন নিয়ে মনুর ধারণায়। মনু শূদ্র শব্দটি সামান্য বা সাধারণ অর্থে প্রয়োগ করেছেন। শূদ্র অনেক ভাবে হতে পারে । শূদ্রযোনিতে উৎপন্ন ব্যক্তি শূদ্র। শুধু তাই নয়, উচ্চবর্ণের কোনও ব্যক্তি ক্রিয়ালোপাৎ অর্থাৎ স্বধর্মচ্যুত হলে শূদ্রতুল্য বিবেচিত হতেন। দ্বিজ হীনজাতীয় নারীকে বিবাহ করে শূদ্রত্ব প্রাপ্ত হতেন। যে দ্বিজ বেদাধ্যয়ন না করে শূদ্রের কার্যে প্রবৃত্ত হন, তিনিও শূদ্র বলে গণ্য হতেন। অর্থাৎ মনুর মতে শুধু জন্মের ওপর নির্ভর করে নয়, কর্মের উপর নির্ভর করেও শূদ্র হিসেবে বিবেচিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। মনু বলেছেন , শূদ্র বহু অর্থ সঞ্চয় করতে পারবে না , কারণ, তার প্রভূত সম্পদ থাকলে সে গর্ব ভরে ব্রাক্ষণদের উপর অত্যাচার করতে পারে। যে পথ দিয়ে উচ্চবর্ণের লোকেরা যাতায়াত করেন, সেই পথে শূদ্রের মৃতদেহ বহন করা চলবে না। ব্রাহ্মণেরা শূদ্ররাজার রাজ্যে বাস করবেন না। আইন কানুনের ক্ষেত্রেও শূদ্রের সম্বন্ধে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা রয়েছে। ইচ্ছুক বা অনিচ্ছুক ব্রাহ্মণ নারীর সঙ্গে অবৈধ যৌন সংযোগের অপরাধে শূদ্রের মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ রয়েছে। শূদ্রনারীর সঙ্গে অনুরূপ সংযোগের অপরাধে ব্রাহ্মণের পক্ষে মাত্র কিছু জরিমানার বিধান আছে। ব্রাহ্মণ কর্তৃক শূদ্রহত্যা উপপাতক মাত্র, কিন্তু ব্ৰহ্মহত্যার অপরাধে শূদ্রের মৃত্যুদণ্ড ছাড়া নিষ্কৃতি নেই।
এবার প্রশ্ন হল আর এসএস কি দেশ গড়তে মনু সংহিতাকে আদর্শ করতে চেয়েছেন? ১৯৪৯ সালে যখন ভারতের সংবিধান গৃহীত হয়, তখন আরএসএস-এর মুখপত্রে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে ভারতীয় সংবিধানের পরিবর্তে মনু সংহিতা বা মনু কোড কে ভারতের আইন হিসেবে গ্রহণ করার দাবি জানানো হয়েছিল। যদিও আরএসএস সরাসরি অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে কথা বলে। আরএসএস-এর অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক গুরু এম.এস. গোলওয়ালকর তাঁর বিভিন্ন লেখায় মনু সংহিতার মতো প্রাচীন বিধিবিধানকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাহলে কি এটাই প্রমাণ হল আর এসএস শতশতাংশ মনু সংহিতাকে অনুসরণ করতে বলে? একদমই না। মনু সংহিতার সারাংশ হয়তো বা উন্নততর হিন্দুরাষ্ট্র গড়ে তুলতে উপযোগী। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে মনু সংহিতা লেখা হয়েছিল যে সময়ে, তখন রাজনৈতিক- সামাজিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। সুতরাং এই মতাদর্শ অন্ধের মত এখন অনুসরণ কখনওই লাভদায়ক নয়।