দ্বিতীয় দফার ভোট শুরুর আগে থেকেই ফলতা বিধানসভা কেন্দ্র শিরোনামে উঠে আসে দুজনের সৌজন্যে। প্রথমজন ওই কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খান। এবং, দ্বিতীয়জন উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা সিংহম আইপিএস অজয় পাল। এবং, সিংহম বনাম পুষ্পা-র চলমান দ্বৈরথের মধ্যেই ভোট হয় ফলতায়। এবং, সেখানে ইভিএম কারচুপির অভিযোগ ওঠে। বাকিটা ইতিহাস। নজিরবিহীনভাবে গোটা ফলতা বিধানসভার ভোট বাতিল করে দেয় কমিশন এবং ফল গণনার সপ্তাহদুয়েক বাদে সেখানকার ২৮৫ টি বুথেই পুনর্নির্বাচনেক বিজ্ঞপ্তি জারি করে।
ঘটনাচক্রে অভিষেক বন্দ্যোরপাধ্যায়ের লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যেই পড়ে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্র। এমতাবস্থায়, ফলতা নিয়ে অভিষেককে খোঁচা দিয়ে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করলেন বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্য। পাল্টা পোস্ট করতে বেশি সময় নিলেন না অভিষেকও।
'ডায়মন্ডহারবার মডেল'
রাজ্যে দ্বিতীয় দফার ভোটে কমিশনের কাছে মুহুর্মুহু অভিযোগ আসতে থাকে দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে। ফলতা, ডায়মন্ড হারবার, মগরাহাট পশ্চিমে ইভিএমে কারচুপি হচ্ছে বলে দাবি করেন বিরোধীরা। অনেক জায়গায় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে, কেন্দ্রীয় বাহিনী ও রাজ্যপুলিস লাঠি নিয়ে তাড়া করে। এবং দিনশেষে প্রশ্ন ওঠে, প্রথম দফায় যেভাবে শান্তিপূর্ণ ভোট করিয়েছিল কমিশন, দ্বিতীয় দফায় তা সম্ভব হল না কেন?
এমতাবস্থায়, কমিশন-সূত্রে সেদিন রাতেই আভাস পাওয়া গিয়েছিল যে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বেশ কয়েকটি বিধানসভার বেশ কিছু বুথে পুনর্নির্বাচনের কথা ভাবা হচ্ছে। এবং, পরেরদিনই দক্ষিণ ২৪ পরগনায় পৌঁছে যান কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত। তাঁর রিপোর্টের ভিত্তিতেই ডায়মন্ডহারবার ও মগরাহাট (পশ্চিম) বিধানসভা কেন্দ্রের মোট ১৫ টি বুথে পুনর্নির্বাচন হয় শনিবার।
এরপরই রাজনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয় জাহাঙ্গির খানের ফলতা নিয়ে। সেখানে কবে পুনর্নির্বাচন? ভোট গণনার পর কি পুনর্নির্বাচন ঘোষণা করে নজির গড়বে কমিশন? পুনর্নির্বাচন হলে তা কত বুথে হবে?
শনিবার রাতেই জল্পনা-জাল ছিন্ন করে কমিশন জানিয়ে দেয়, গোটা ফলতা বিধানসভার ভোটই বাতিল হচ্ছে এবং ২১ মে সবকটি বুথেই (২৮৫) পুনর্নির্বাচন হবে। এমতাবস্থায়, ইভিএম-এ সেলোটেপ বা ব্ল্যাকটেপ সাঁটিয়ে দেওয়ার অভিযোগে বিদ্ধ হয় শাসক দল। এবং, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'ডায়মন্ড হারবার মডেল'কে খোঁচা দিতে শুরু করে বিরোধী শিবির। বিজেপি নেতা অমিত মালব্য সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে লেখেন: "ডায়মন্ড হারবার মডেল ভেঙে চুরমার"। পাল্টা পোস্ট করতে বেশি সময় নেননি অভিষেকও: "বাংলা বিরোধী গুজরাতি গ্যাং ও তাঁদের হাতের পুতুল জ্ঞানেশ কুমার দশবার জন্ম নিলেও ডায়মন্ডহারবার মডেলে দাঁত ফোটাতে পারবেন না। আপনাদের যা আছে সব নিয়ে আসুন। আমি পুরো কেন্দ্রীয় সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি, ফলতায় আসুন। আপনাদের সর্বশক্তিমান একজন গডফাদারকে দিল্লি থেকে পাঠান। যদি হিম্মত থাকে তাহলে ফলতা থেকে লড়ে দেখান"।
ইভিএম কারচুপি?
রাজ্যের বিরোধী শিবির ফলতা, ডায়মন্ডহারবার ও মগরাহাট নিয়ে প্রতিবারের মতো এবারও অভিযোগ করেছে। কী সেই অভিযোগ? ইভিএমে এমনভাবে সেলোটেপ লাগানো হয় যে ঘাসফুল ছাড়া অন্য কোনও প্রতীকে বোতাম টেপাই সম্ভব হয় না। কিছু জায়গায় আতর-কাণ্ডও ঘটে বলে দাবি। অর্থাৎ, ঘাসফুলের বোতামে আতর মাখানো থাকবে। কোনও ভোটার যদি ঘাসফুল ব্যতীত অন্য কোনও প্রতীকে ভোট দেন, তাহলে আঙুলের গন্ধ শুঁকেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শনাক্ত করা যাবে যে, তিনি তৃণমূলকে ভোট দেননি। এবং, ভোটের ফল ঘোষণার পর তাঁর পরিবাররে পরিণতি হয়ে ভয়ঙ্কর।
এই পরিস্থিতিতে, একাধিক রিপোর্ট খতিয়ে দেখে কমিশন জানতে পারে, বেশ কিছু ইভিএমে এবারও এই ধরনের কাণ্ড ঘটেছে। এমনকি, ওয়েবক্যাম 'বিকল' থেকেছে কিছু জায়গায়। বিরোধীদের দাবি, এই নিখুঁত নিঃশব্দ অপারেশনের দায়িত্বে থাকেন স্বয়ং জাহাঙ্গির খান। শুধু তা-ই নয়। ভয় দেখিয়ে এইসব কেন্দ্রের ভোটারদের থেকে নাকি ভোটার কার্ড কেড়ে নেয় জাহাঙ্গির-বাহিনী। তারপর 'চুপচাপ ফুলে ছাপ'।
যদিও, বিরোধীদের এই অভিযোগ হতাশার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়, পাল্টা দাবি শাসকশিবিরের।