বেশ কয়েক যুগ আগের কথা। তখনও স্কুল ফেরত কচিকাঁচারা এই সময়টা নিয়ম করে ন্যাড়া টেনিস বল দিয়ে ক্রিকেট ম্যাচ খেলত। তখন ছিল শচীন তেন্দুলকরদের শুরুর সময়। বাজার কাঁপাচ্ছেন আজাহারউদ্দিন। ওদিকে। ইমরান খান, ওয়াশ...
বেশ কয়েক যুগ আগের কথা। তখনও স্কুল ফেরত কচিকাঁচারা এই সময়টা নিয়ম করে ন্যাড়া টেনিস বল দিয়ে ক্রিকেট ম্যাচ খেলত। তখন ছিল শচীন তেন্দুলকরদের শুরুর সময়। বাজার কাঁপাচ্ছেন আজাহারউদ্দিন। ওদিকে। ইমরান খান, ওয়াশিম আক্রম, ডোনাল্ড আগুণ ঝড়াচ্ছেন। একটা ল্যাটা বাঙালি তখন সবে বাইশ গজে নেমেছে। তখনও চামড়ার কভারে ঢাকা ব্যাডমিন্টন ব়্যাকেট মানে বন্ধু মহলে আলাদা সম্ভ্রম। ভিকি, হেনরির মত ক্যাম্বিস বল বাজার কাঁপাচ্ছে। তখনও বাবার হাত ধরে ধর্মতলায় গেলে শীতের সময় নাহুমসের কেক ছিল মাস্ট। তখনও বইয়ের ফাঁকে লুকিয়ে চলত আনন্দমেলা, শুকতারা, চাঁদমামা সন্দেশ। তেপান্তর, ঝুমঝুমি, পক্ষীরাজ, বোধন, বলাকা, আগমনীর মতন পুজাবার্ষিকী গুলি প্রকাশ পেত পুজোর ঠিক মুখে।

শীত কাল মানে মোটামুটি ভাবে সব উৎসব শেষ। সামনে শুধু বড়দিন আর সরস্বতী পুজো। তখনও আমাদের মত উঠতি কিশোররা হাঁ করে তাকিয়ে থাকত কোচিনের ফিস্ট গুলির দিকে। মোবাইল ছিল না। নোকিয়ার মোবাইলে সাপের গেমও এসেছে অনেক পরে। তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ করে অনিল ভৌমিকের ফ্রান্সিস কিংবা, স্বপন কুমারের দীপকে ব্যানার্জির কাণ্ডকারখানা গিলতে থাকতাম, যতক্ষন না জোর করে আলো নিবিয়ে দেওয়া হতো। হাঁদা-ভোদার সঙ্গে নন্টে-ফন্টের মারপিট হলে কে জিতবে তা নিয়ে তর্কও চলত ক্রিকেটের মাঠে। ঘনাদা বনাম টেনিদা । হর্ষবর্ধন-গোবর্ধন বনাম প্রফেসর নাটবল্টু । জনপ্রিয়তার মাপদন্ডে মাপার ব্যর্থ প্রয়াসও ঝগড়ার স্তরে পৌঁছে যেত প্রায়ই।পাড়ার রানা, তোতা, সন্তুরা হয়ে উঠত ষষ্ঠীবাবুর বাবলু, বিলু, ভোম্বল।

সত্যজিত একবার সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়কে বলেছিলেন যে তাঁর গল্পের ঝুলি শেষ হয়ে আসছে। কারন তাঁর গল্পে সেক্স আর ভায়োলেন্সের প্রবেশ নিষেধ। সত্যি কিন্তু তখনকার শিশু গোয়েন্দা সাহিত্য গুলি প্রায় মহিলা বর্জিত ছিল। ব্যাতিক্রম অবশ্যই সুচিত্রা ভট্টাচার্য। আর ব্যোমকেশ কে শিশু সাহিত্য থেকে দুরে রাখাই তখন পর্যন্ত রীতি ছিল। ছোট আকারে বাটুলের গল্পের বদলে নারায়ন দেবনাথ পুজোয় উপহার দিতেন বাটুলের উপন্যাস। তাছাড়াও দেব সাহিত্য কুটীরে প্রকাশিত রাজকুমার মৈত্রের বগলা মামার গল্প, অদ্বৃশ বর্ধনের প্রফেসর নাটবল্টু চক্র, অথবা টারজান, ম্যানড্রেক, অরণ্যদেব । পুজাবার্ষিকী তখন শিশুদের কাছে আস্ত প্যান্ডোরা বক্স।

এখন আর সেভাবে শিশু সাহিত্য তৈরি হয় কোথায়? লেখকের কলম থমকে গেছে ব্যবসার জালে। তার ওপর হ্যারিপটার, ক্যারবিয়ান পাইরেটসদের দাপটে দুরে সরে যাচ্ছে দেশজ সংস্কৃতি। যদিও টিনটিন, অ্যাসটেরিক্স-ওবেলিক্সরা বঙ্গ সাহিত্যে ঢুকে পড়েছে তাও বেশ কয়েক দশক হয়ে গেল। মোটের উপর এখন শিশু জীবনে সময় কাটানোর হাজার উপকরণ। বই পড়ার সময় কোথায়? পিছোতে পিছোতে অদৃশ্য হতে চলেছে শিশু সাহিত্য।