ছাব্বিশের বিধানসভার হ্যাশট্যাগ একটাই: এবার ভোট অন্যরকম হবে। এমতাবস্থায়, রানাঘাটে ভোটকর্মীর মার খাওয়া আর ভাঙড়ে নিয়মিত রাজনৈতিক হিংসার খবরের প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল শুধু চারটি শব্দ ব্যয় করলেন: "সব পিসফুল হয়ে যাবে"।
পর্যবেক্ষকরা দেখছেন, ভোট যত এগিয়ে আসছে, ততই বেপরোয়া হয়ে উঠছে শাসক ও বিরোধী দল। যার যেখানে শক্তি, সে সেখানে তার আস্ফালন করছে। এদিন ভোটকর্মীদের প্রশিক্ষণ চলাকালীন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রানাঘাট-১ নম্বর ব্লকের একটি স্কুল। ভোট প্রশিক্ষণের জায়ান্ট স্ক্রিনে রাজ্য সরকারের প্রচারমূলক ভিডিয়ো দেখানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত। অভিযোগকারী শিক্ষকের কথায়, 'জায়ান্ট স্ক্রিনে দিঘার মন্দির নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রচার চলছিল। আমি বলেছিলাম, এতে নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘন হচ্ছে। তারপর সেই প্রচার বন্ধ হল। এরপরেই কয়েকজন এসে ধমক দিতে শুরু করল। পরে আমি তাদের আইডি কার্ড দেখতে চাওয়ায় আমাকে বাইরে টেনে নিয়ে গিয়ে মারধর করা হল। খুনের হুমকিও দেওয়া হল।' এরপরেই তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "অবিলম্বে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে প্রহসনের নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়া হোক"।
রানাঘাটে ভোটকর্মীকে মারধরের ঘটনায় রিপোর্ট তলব করেছে নির্বাচন কমিশন। রাজ্য পুলিশের ডিজি, জেলাশাসক, জেলার পুলিশের সুপার, মহকুমাশাসকের কাছে রিপোর্ট তলব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে মনোজ আগরওয়াল জানান, "ডিজি রিপোর্ট দিয়েছেন। এফআইআর হয়েছে। যা পদক্ষেপ করার তা করা হচ্ছে"।
আর ভাঙড়? ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হেসে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বললেন, "সব পিসফুল হয়ে যাবে"।
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, জ্ঞানেশ কুমারের দাওয়াই ইতিমধ্যেই কাজ করতে শুরু করে দিয়েছে। ভোট ঘোষণার অনেক আগে রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী এসেছে। ওই বাহিনীকে যাতে যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়, সেদিকে কড়া নজর রেখেছে কমিশন। দুদিনের বঙ্গসফরে এসে, দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার খুব তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বলেছেন, "রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের তপোভূমিতে দাঁড়িয়ে নির্বাচন কমিশন আবারও পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি ভোটারকে বার্তা দিতে চায়, নির্বাচন হবে অহিংস (Violence Free) এবং ভয়শূন্য (Intimidation Free)"। পর্যবেক্ষকরা গুরুত্ব দিচ্ছেন দ্বিতীয়টির উপর। যে-চোখরাঙানি চোখে দেখা যায় না, যে-হুমকি কানে শোনা যায় না, একেবারে ঠিক সেই জায়গাতেই জোর দিয়েছেন তিনি: 'ইন্টিমিডেশন ফ্রি (Intimidation Free)'। বুথের ভিতর যতটা নজর কমিশনের, ঠিক ততটাই নজর বুথের বাইরে। রাজ্যের আমলা ও পুলিস কর্তাদের স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার, শুধু ভোটের দিন কোথাও কোনও রক্তপাত হবে না, তা নয়, 'নিঃশব্দ অদৃশ্য সন্ত্রাস'ও এবার আর বরদাস্ত করা হবে না। রাজ্যের এডিজি (আইন-শৃঙ্খলা) বিনীত গোয়েলকে ধমক দিয়ে তিনি বলেছেন, "সব জানি, বসুন"। বেশ কয়েকজন জেলাশাসককে সতর্ক করে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, সব কাজের 'ডিজিটাল ফুট প্রিন্ট' রয়েছে ও রয়ে যাবে, তাই, বেচাল দেখলে ভোট-পর্ব শেষ হওয়ার পরেও পদক্ষেপ করবে কমিশন।
এরপর তৃণমূলনেত্রীকে প্রশ্ন করা হয়, কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত জানিয়েছেন, বাংলায় যেভাবে ভোট হয় এবার তা হবে না, বাংলার ভোট-কালচার পাল্টাবে, কী বলবেন? মমতার তীব্র প্রতিক্রিয়া, "উনি (সুব্রত গুপ্ত) জোর করে সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণ করেছিলেন, তা কি ভুলে গিয়েছেন? সিঙ্গুরে তাপসী মালিকের ঘটনা মনে করিয়ে দেবো? এর থেকে বেশি আর ওঁর সম্বন্ধে আমার বলার কিছু নেই"।
পর্যবেক্ষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, কালীঘাট থেকে দলের প্রার্থী তালিকা প্রকাশের দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করা হয়, কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত বলেছেন, বাংলায় যেভাবে ভোট হয় এবার তা হবে না, বাংলার ভোট-কালচার পাল্টাবে, কী বলবেন? মমতার তীব্র প্রতিক্রিয়া, "উনি (সুব্রত গুপ্ত) জোর করে সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণ করেছিলেন, তা কি ভুলে গিয়েছেন? সিঙ্গুরে তাপসী মালিকের ঘটনা মনে করিয়ে দেবো? এর থেকে বেশি আর ওঁর সম্বন্ধে আমার বলার কিছু নেই"। এখানেই শেষ নয়। এরপর অন্য এক সাংবাদিক যখন তাঁকে অন্য প্রশ্ন করতে শুরু করেন, তখন কার্যত তাঁকে থামিয়ে দিয়ে ফের সুব্রত গুপ্তর প্রসঙ্গ টেনে এনে দৃশ্যতই ক্রুদ্ধ মমতা বলেন, "(ভোট) কালচার মানে কি বিজেপির ডান্স করা? উনি (সুব্রত গুপ্ত) এখানকার কালচার কী চেঞ্জ করবেন? বেঙ্গলের কালচার, বাংলার কালচার, বাংলাতেই থাকবে। উনি নিজের কালচার ঠিক করুন আগে"।
বাংলায় ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার দিনেই নজিরবিহীনভাবে রাজ্যের মুখ্য সচিবকে সরিয়ে দেয় কমিশন। সেইসঙ্গে স্বরাষ্ট্রসচিবকেও। এরপর একে-একে প্রায় ৫০ জন আমলা ও পুলিস কর্তাকে অপসারণ করে দিল্লির নির্বাচন সদন। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, যাঁদের অপসারণ করা হয়েছে, তাঁদের সম্বন্ধে খুঁটিয়ে খবর নিয়েছে কমিশন। এবং, ভিনরাজ্য থেকে পর্যবেক্ষক হিসেবে যাঁদের নিয়োগ করা হয়েছে বাংলায়, তাঁদের দক্ষতা নিয়েও খোঁজখবর করেছে কমিশন।
শুধু তা-ই নয়। প্রতিবার অভিযোগ ওঠে, কেন্দ্রীয় বাহিনী এলেও লাভ হয় না, কারণ তাদের 'ম্যানেজ' করা হয়। এমতাবস্থায়, কর্তব্যরত অবস্থায় আমন্ত্রণ-নিমন্ত্রণে যাওয়ার কারণে মুর্শিদাবাদে বাহিনীর বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করেছে কমিশন। এবং, বুঝিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, অন্যবারের মতো নিষ্ক্রিয় থাকবে না বাহিনীর জওয়ানরা।
এদিন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি ও মন্তব্য আবারও একবার বুঝিয়ে দিল, ছাব্বিশের বিধানসভার হ্যাশট্যাগ একটাই: এবার ভোট অন্যরকম হবে।