ওস্তাদের মার শেষ রাতে। নরেন্দ্র মোদীর মারও শেষ রাতে।
সিএএ আর এসআইআর নিয়ে চলমান অনিশ্চিয়তার মাঝে এই সেদিনও বাংলায় এসে মতুয়াদের কোনও ভরসা-বাক্য শোনাতে পারেননি নরেন্দ্র মোদী। এমতাবস্থায়, মতুয়াগড়ে গেরুয়া শিবিরের পায়ের তলায় যেটুকু মাটি ছিল, সেটুকুও সরে যায়। মতুয়া সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশের কাছে গণশত্রু হিসেবে চিহ্নিত হন ঠাকুরবাড়ির গেরুয়া শিবিরের প্রতিনিধি তথা সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর। কিন্তু, খেলা ঘুরে যায় আচমকাই। ১৬ ফেব্রুয়ারি এসআইআরের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের অনেক আগেই, সিএএ-তে আবেদনকারী মতুয়াদের দ্রুত নাগরিকত্বের শংসাপত্র দিতে রীতিমতো সক্রিয় হয় কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। এবং, একবার নাগরিকত্বের শংসাপত্র হাতে পেলে এসআইআর-পর্বে ভোটার তালিকায় নাম তুলতে তিলমাত্র সমস্যার মধ্যে পড়তে হবে না মতুয়াদের। দাবি করছেন পর্যবেক্ষকরা।
খেলা ঘুরল কীভাবে?
রাজ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে এসআইআর শুরু হওয়ার পর মতুয়া ঠাকুরবাড়ির দুই শিবির ময়দানে নেমে দুভাবে খেলা শুরু করেছিল। ঘাসফুল শিবিরের মমতাবালা ঠাকুর নিবিড় সংশোধনীর বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে অনশনের কর্মসূচি নিয়েছিলেন। অন্যদিকে, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ-তে আবেদন করে নাগরিকত্ব পেলে এসআইআর নিয়ে চিন্তার কোনও কারণ নেই, মতুয়াদের এমনটাই বুঝিয়েছিলেন গেরুয়া শিবিরের শান্তনু ঠাকুর।
খেলার প্রথমার্ধে মমতাবালার ঘাসফুল শিবিরকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যায় শান্তনুর পদ্ম-শিবির। উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়ায় পর-পর সিএএ-সহায়তা শিবির খোলে গেরুয়াশিবির। এমতাবস্থায়, মতুয়া সমাজের একটা বড় অংশ মনে করে, এসআইআর-বিরোধিতার বদলে সিএএ-শিবিরে যাওয়াই বিচক্ষণতার কাজ হবে। এবং সেই ভাবনা থেকে মতুয়া সমাজের কয়েকহাজার মানুষ সিএএ-তে নাগরিকত্বের আবেদন করেন।
দ্বিতীয়ার্ধে খেলা ঘুরে যায়। এসআইআর সংক্রান্ত এক মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানায়, নাগরিক না-হলে ভোটার তালিকায় নাম তোলা যাবে না। এমতাবস্থায় আতান্তরে পড়েন কয়েকহাজার মতুয়া, যাঁরা ইতিমধ্যেই সিএএ-তে আবেদন করে কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন, তাঁরা এ-দেশের নাগরিক নন। পর্যবেক্ষকদের বক্তব্য, সিএএ-তে আবেদন করে রাজ্যের বেশ কয়েকজন নাগরিকত্ব পেয়েছেন ঠিকই। তবে, আবেদন যাচাই করে নাগরিকত্ব দেওয়ার যে প্রক্রিয়া, তা দুদিনে সম্পন্ন হওয়া সম্ভব নয়। খুব তাড়াতাড়ি হলেও মাসছয়েক লাগার কথা। তাছাড়া, এত অল্প সময়ের মধ্যে হাজার-হাজার আবেদন এলে, খতিয়ে দেখতে আরও বেশি সময় লাগবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের, এটাই স্বাভাবিক। এদিকে, ততদিনে এসআইআর-এর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হয়ে যাবে।
এখানেই শেষ নয়। খেলা হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে এক ভয়ঙ্কররকম আলটপকা মন্তব্য করে বসেন শান্তনু ঠাকুর। যার নির্যাস হল: ৫০ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাদ দেওয়ার জন্য যদি এক লাখ মতুয়াকে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, তাহলে তা-ই সই। এরপর আগুনে ঘি পড়তে আর বেশি সময় লাগে না। সহোদর সুব্রত ঠাকুর থেকে শুরু করে বিধায়ক অসীম সরকার, শান্তনুর বক্তব্যের প্রবল বিরোধিতা করেন। এমতাবস্থায়, মতুয়া ঠাকুরবাড়িতে শান্তনুর দেখা করতে এসে মমতাবালাপন্থীরা বেধড়ক মার খান। যার জল গড়ায় অনেকদূর পর্যন্ত। পর্যবেক্ষকরা ধরেই নেন, উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়ার মতুয়া-অধ্যুষিত বিধানসভাগুলিতে এবার বিজেপির ভরাডুবি অবধারিত।
এই পরিস্থিতিতে, গেল বছরের ২১ ডিসেম্বর বাংলায় এসে নরেন্দ্র মোদী মতুয়াদের কোনও ভরসা-বাক্য শোনাতে পারেননি। যদিও, বাংলা থেকে ফিরে গিয়ে এক্স হ্যান্ডেলে মতুয়াদের পাশে-থাকার দায়সারা-বার্তা দিয়ে মোদী লেখেন: আমরা মতুয়া ও নমশূদ্রের পাশে আছি। বলাই বাহুল্য, এই শুকনো-বার্তায় আশ্বাসের চিঁড়ে ভেজেনি। বরং, মতুয়াগড়ে আরও কোণঠাসা হয়ে পড়েন শান্তনু ঠাকুর।
এই পরিস্থিতিতে আচমকাই খেলা ঘোরে। বলা ভালো, খেলা ঘুরিয়ে দেন নরেন্দ্র মোদী। চলতি বছরের প্রথম সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গে ডিরেক্টর অব সিটিজেন রেজিস্ট্রেশন ও ডিরেক্টর অব সেন্সাস অপারেশন পদে স্থায়ী নিয়োগ করে কেন্দ্র। আমলা মহলের একাংশ মনে করছে, পড়ে থাকা সিএএ-আবেদনপত্র খতিয়ে দেখে দ্রুত নাগরিকত্বের শংসাপত্র দিতেই এই নিয়োগ। কারণ, এই দুই দফতরের হাতেই রয়েছে নাগরিকত্বের চাবিকাঠি। অন্যদিকে পর্যবেক্ষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বাংলায় এসআইআরের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হবে ১৪ ফেব্রুয়ারি। এর মধ্যে, মতুয়ারা নাগরিকত্বের শংসাপত্র পেয়ে গেলে, অনায়াসেই ভোটার তালিকায় নাম তুলতে পারবেন। ইতিমধ্যেই, সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, সিএএ-র আবেদনপত্র দেখিয়ে ভোটার তালিকায় নাম তোলা যাবে না ঠিকই, তবে, নাগরিকত্ব পেয়ে গেলে কারুকে বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হবে না।
ওস্তাদের মার শেষ রাতে। নরেন্দ্র মোদীর মারও শেষ রাতে।