দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে লেখা সর্বশেষ চিঠিতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ তুলেছিলেন: বহুতল আবাসনে কেন বুথ তৈরি হবে?
এবার কার্যত নজিরবিহীনভাবে বহুতল আবাসনে বুথ তৈরির কথা ভাবছে নির্বাচন কমিশন। ন্যূনতম ভোটার সংখ্যা কত হলে বুথ তৈরি হবে, আর কোন কোন শর্ত পূরণ করতে হবে, তা নিয়ে অবশ্য বিশদে এখনও কিছু জানায়নি কমিশন। তবে প্রশ্ন উঠেছে মুখ্যমন্ত্রীর চিঠি নিয়ে। বহুতল-বুথ নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে প্রশ্ন তুলেছেন, তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। তার কারণ এক নয়, একাধিক। প্রথমত, বহুতল আবাসনে থাকা উচ্চ মধ্যবিত্ত ভোটারদের জন্য আলাদা করে বুথ তৈরি হলে, অন্য ভোটারদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হবে। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট বহুতলে কোন রাজনৈতিক দলের প্রভাব থাকবে, ভোট প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ হবে, তা অনেকটাই নজরের আড়ালে চলে যাবে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য যথাযথ ও সঙ্গত। কিন্তু..।
এর মধ্যে যে 'কিন্তু' রয়ে গিয়েছে, তা-ও কিন্তু পর্যবেক্ষকদের নজর এড়িয়ে যায়নি।
শাসক নেতাদের কেউ কেউ একান্ত পরিসরে বলছেন, ২০১১ সালে পালাবদলের নির্বাচনে যে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি দু-হাত ভরে আশীর্বাদ করেছিল তৃণমূলকে, তারা এখন বিমুখ। শুধু বিমুখ বললে ভুল বলা হয়। শিক্ষিতদের মধ্যে নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত হয়ে উচ্চ মধ্যবিত্তদের একটি বড় অংশই এখন তৃণমূলের প্রতি তিতিবিরক্ত। তার কারণ একাধিক। ২০১১-র কয়েকবছরের মধ্যেই সারদা কেলেঙ্কারিতে তৃণমূল নেতাদের নাম উঠে আসে। আদালতের নির্দেশে সিবিআই তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই রাজ্য সরকার সিট তৈরি করে তথ্যপ্রমাণ লোপাট করে বলে অভিযোগ ওঠে। সারদায় যাঁরা তাঁদের অর্থ গচ্ছিত রেখেছিলেন এবং যাঁরা রাখেননি, দু-পক্ষই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এই চিটফান্ড কেলেঙ্কারির ঘটনায়। সারদার পরেই রোজভ্যালি কেলেঙ্কারি। এরপর এক-এক করে চিটফান্ড কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটতেই থাকে। আর, প্রায় প্রতিটি ঘটনায় শাসকনেতাদের নাম জড়িয়ে পড়ে। এমতাবস্থায়, ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে পোস্তায় উড়ালপুল ভেঙে পড়ে। এদিকে, নারদকাণ্ডে টাকা নিতে দেখা যায় তৃণমূল নেতানেত্রীদের। পর্যবেক্ষকরা কেউ কেউ মনে করেন, সেবারই, ২০১৬-র নির্বাচনে, তৃণমূলের বিরুদ্ধে বাম-কংগ্রেস জোট জয়ী হত, যদি-না মাঝখান থেকে বিরোধী ভোটে ভাগ বসাতো বিজেপি।
এরপর রক্তক্ষয়ী পঞ্চায়েত ভোটে হতাহতের সংখ্যায় আর যথেচ্ছ ছাপ্পায় তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ে। পর্যবেক্ষকদের দাবি, সেই কারণেই ২০২৯-এর লোকসভায় অভাবনীয়ভাবে বাংলা থেকে ১৮ টি আসন জেতে বিজেপি।
এখানেই শেষ নয়।
এরপর গরু-কয়লা পাচারে যুক্ত থাকার অভিযোগ ওঠে শাসকনেতাদের বিরুদ্ধে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা মাঠে নামে। পাহাড় প্রমাণ নিয়োগ দুর্নীতির ঘটনায় গ্রেফতার হন রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী ও শাসকদলের তৎকালীন মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়। ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ বহ্নিশিখা হয়ে জ্বলে ওঠে আরজিকর-কাণ্ডে।
এমতাবস্থায়, পাড়ায়-পাড়ায় 'দাদা'-স্পনসর্ড খেলা, মেলা, অম্বুবাচী, নীলষষ্ঠী, গণেশ পুজো, রামনবমীতে মাত্রাতিরিক্ত মাইকের শব্দ আর ডিজের দাপটে তিতিবিরক্ত হয়ে ওঠে নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ। অন্যদিকে, রাতবিরেতে বাইকের সাইলেন্সর খুলে বিকট শব্দে বিকৃত বাসনা চরিতার্থ করতে দেখা যায় অনেককে, যাদের একটা বড় অংশই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বলে দাবি করা হয়।
এমতাবস্থায়, পর্যবেক্ষরা কেউ কেউ বলছেন, তৃণমূলের প্রতি তিতিবিরক্ত নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ এখন থাকে বহুতল আবাসনে। দোতলা-তিনতলা বাড়ি আর চোখে দেখা যায় না সেভাবে। শাসক-বিরোধী সব পক্ষের প্রতি বিরূপ থাকা এই নাগরিকদের অনেকেই ভোটের দিন বুথমুখী হন না। দু-ভাবে তা শাসকদলকে সুবিধা করে দেয়। বুথমুখী না-হওয়া ওই ভোটারদের হয়ে ছাপ্পা মারা। আর, ছাপ্পা না-মারলেও লাভ। শাসক-বিরোধী ক্ষোভ তথা ভোট ইভিএম-এ প্রতিফলিত হয় না।
এই পরিস্থিতিতে, বহুতল আবাসনের ভিতরেই বুথ হলে, বুথমুখী না-হওয়া ভোটাররা এবার বুথমুখী হবেন বলে মনে করা হচ্ছে।এমনকি, আবাসনে থাকা প্রবীণরাও অশক্ত শরীরে ভোট দিতে যাবেন। সবমিলিয়ে, শাসক-বিরোধী ভোটের সংখ্যা বাড়বে। এমতাবস্থায়, কাটাকুটির খেলায়, 'হঠাৎ যে কী হয়, কিচ্ছু বলা যায় না'।
প্রসঙ্গত, রাজ্যের জেলা সদর বা গ্রামগঞ্জের তুলনায় কলকাতায় শতাংশের হিসেবে কম ভোট পড়ে। তাই, আরও বেশি ভোটারকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে কমিশন। বহুতলে বুথ তৈরির ভাবনা সেই কারণেই। এই পরিস্থিতিতে, পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, বহুতল বুথে বইতে পারে সরকার-বিরোধী হাওয়া।