রাজ্যে শব্দদূষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে গত তিনদশকে নিহত হয়েছেন ১৫ জন। যাঁদের শব্দ শহিদ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এমতাবস্থায়, রাজ্যে ডিজে আর মাইকের দাপট নিয়ে পরিবেশ কর্মীদের সবুজমঞ্চ প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কাছে দাবিসনদ পেশ করতে চলেছে। এবং, মঞ্চের একটি প্রতিনিধি দল শাসক-বিরোধী সব দলের নেতানেত্রীদের দরজায় কড়া নেড়ে তাঁদের মনে করিয়ে দিতে চলেছে পরিবেশ সংক্রান্ত দায়-দায়িত্বের কথা।
চাকদহ বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থার পক্ষ থেকে বিবর্তন ভট্টাচার্যর দাবি, "চাকদহ কিন্তু এখন নো-ডিজে জোন। শব্দদূষণ নিয়ে আমরা ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন করে আসছি। ২০১৬ সালে পৌরসভাকে দিয়ে একটি আদেশনামা বা বিজ্ঞপ্তি জারি করাতে পেরেছি, চাকদহে ডিজে বাজবে না। সেই আদেশ কার্যকরী করতে যাতে পুলিস প্রশাসন বিশেষ ভূমিকা নেয়, সেদিকেও নজর রেখেছি। শব্দদূষণ নিয়ে ভিডিয়ো বার্তা দিয়েছেন আইসি। খোঁজ নিয়ে দেখবেন, ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে এখানে কিন্তু গতকাল ডিজে বাজেনি"।
রাজ্যজুড়ে পরিবেশ কর্মীদের যৌথ প্ল্যাটফর্ম সবুজমঞ্চ শব্দদূষণ থেকে শুরু করে বায়ুদূষণ, জলা বুজিয়ে নির্মাণের বিরুদ্ধে সোচ্চার। মঞ্চের পক্ষ থেকে পরিবেশ কর্মী নব দত্ত জানান, "আমরা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কাছে দাবিসনদ পেশ করবো। আমাদের প্রতিনিধি দলও যাবে তাদের কাছে। মাইক-ডিজের দাপট বা শব্দদূষণের বিষয়টি থাকবে আমাদের দাবিসনদে। সেই সঙ্গে থাকবে বায়ুদূষণে রাশ টানা আর জলাভূমি সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সপ্তাহখানেক বাদেই আমরা কাজ শুরু করবো"।
হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়
তিনদশক আগে, ১৯৯৬ সালে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি ভগবতীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় একটি ঐতিহাসিক রায় দেন। যার সারমর্ম হল, উৎসবে মাইক বাজলেও তা কোনওভাবেই ৬৫ ডেসিবেলের উপরে উঠবে না। তার জন্য সাউন্ড লিমিটার যন্ত্র ব্যবহার করতে হবে। এবং, এ দেশের সংবিধান স্পষ্ট বলে দিয়েছে, ধর্মাচরণের স্বাধীনতা কখনও অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না।
বিচারপতি ভগবতীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওই রায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দবন্ধটি ছিল: 'ক্যাপটিভ অডিয়েন্স' (captive audience)। বাংলা তর্জমায়: বন্দিশ্রোতা। যার অর্থ, কেউ তার ইচ্ছেমতো মাইক বা লাউড স্পিকার বাজাবে আর তা শুনতে বাধ্য হবে ওই তল্লাটের হাজার-হাজার মানুষ। অর্থাৎ, কেউ না-চাইলেও তাকে শুনতে হবে, সহ্য করতে হবে শব্দদূষণ। এই-ই হল 'ক্যাপটিভ অডিয়েন্স'-এর মূল কথা। বিচারপতি বন্দ্যোপাধ্যায়ের রায়ে লেখা ছিল, কাউকে বন্দিশ্রোতা (captive audience) বানানো চলবে না।
পরের বছর, ১৯৯৭ সালে, শব্দবাজির সর্বোচ্চ ডেসিবেলও নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন বিচারপতি বন্দ্যোপাধ্যায়। এমতাবস্থায়, প্রথমে কলকাতা পুলিস ও পরে রাজ্য পুলিস হাইকোর্টের এই রায়কে কার্যকর করতে পুরোদমে মাঠে নামে। পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা (political will) ছিল তখন। রাজ্যে তখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জ্যোতি বসু।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৭ সালে শব্দবাজির প্রতিবাদ করে খুন হন দীপক দাস। শেওড়াফুলিতে সেবার কালীপুজোর সময়ে বাজির ভয়ঙ্কর উপদ্রব চলছিল। পেশায় দুধ-বিক্রেতা যুবক দীপকের কাছে পাড়া-পড়শি অনুরোধ করেন কিছু-একটা করার জন্য। অনুরোধকারীদের মধ্যে গর্ভবতী মহিলাও ছিলেন। শব্দদূষণে গর্ভস্থ ভ্রুণ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে, শব্দবাজি ফাটানোর প্রতিবাদ করেন দীপক। তখনকার মতো শান্ত হয় পরিস্থিতি। পরে, সুযোগ পেয়ে, ওই শব্দ-সন্ত্রাসীরা দীপককে খুন করে।
১৫ জন শব্দ শহিদ
এরপর থেকে রাজ্যে ১৫ জন শব্দ শহিদ হয়েছেন। কেউ বাজি ফাটানোর প্রতিবাদ করে, কেউ-বা ডিজে-সাইন্ড বক্সের প্রতিবাদ করে খুন নির্মমভাবে খুন হয়েছেন। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, একটা সময়ে শব্দদূষণ কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হলেও গত ১০ বছরে তা আগের চেয়েও বেশি দাপট নিয়ে ফিরে এসেছে। শুধু তা-ই নয়। উচ্চ ডেসিবেলের শব্দ থেকে শুরু করে আতসবাজি থেকে নির্গত ক্ষতিকর ধোয়ার মধ্যেও এখন ধর্মীয় উপস্থিতি প্রবল থেকে প্রবলতর হয়েছে। এবং, এখন কেউ শব্দদূষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই তাঁকে ধর্ম-বিরোধী বা হিন্দু-বিরোধী বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বিচারপতি ভগবতীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় যখন তাঁর ঐতিহাসিক রায় দেন নব্বইয়ের দশকে। তখন রাজ্যে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের ল-অফিসার ছিলেন বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায়। এখন 'দাবাং' বলতে যা বোঝায়, তখন ঠিক সেই ভূমিকাই পালন করতে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। তাঁর পুত্রসন্তানকে অপহরণ পর্যন্ত করা হয়েছিল। তবুও, দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের আধিকারিক হিসেবে তিনি তাঁর কর্তব্যে অবিচল থেকে শব্দতাণ্ডবকারীদের ঠান্ডা করে দিয়েছিলেন। কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়ার দেড় দশক বাদেও শব্দদূষণ নিয়ে কোনও খবর করতে গেলে সাংবাদিক মহল আগে তাঁকেই ফোন করে। পরিবেশ আকাদেমি চন্দননগর-এ পক্ষ থেকে বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায় ও তাঁর সতীর্থরা প্রতিটি দলের কাছে চিঠি লিখে দাবিসনদ পাঠিয়েছেন। বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায় জানান, "ইটভাটার শ্রমিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন তল্লাটে গিয়ে আমরা নাগরিক সমাজের কাছে আবেদন করেছি, রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীরা এলে তাঁদের প্রশ্ন করুন পরিবেশ নিয়ে কে কী ভাবছেন"।
প্রার্থীদের কাছে পরিবেশ-সনদ
কোনও-না-কোনও রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন পেয়ে এবার বিধানসভায় প্রার্থী হচ্ছেন যাঁরা, তাঁদের কাছে চন্দননগর পরিবেশ আকাদেমি ও শ্রমিক কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে দুটি আলাদা চিঠি পাঠানো হয়েছে। বেআইনি বাজিকারখানা, গ্রাম বাংলার দূষণ, শহরের দূষণ, পার্বত্য ও মালভূমি এলাকায় পরিবেশ বিপর্যয়, প্রাকৃতিক সম্পদের লুন্ঠন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বনাঞ্চল ধ্বংস, জীববৈচিত্র্যের সর্বনাশ, নদী ও জলাভূমি ধ্বংস, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের মতো ইস্যুতে কী-কী পদক্ষেপ করা প্রয়োজন, তা বিস্তারিতভাবে লেখা রয়েছে সেই চিঠিতে।
পরিবেশ কর্মীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, গতবছর কালীপুজোর সময়ে মাঝরাতে শব্দতাণ্ডব রুখতে গিয়ে কোচবিহারের পুলিস সুপার দ্যুতিমান ভট্টাচার্যকে বদলি হতে হয়। স্বভাবতই প্রশাসন ওই বদলিকে 'রুটিন বদলি' বলে দাবি করে। এ-বছর রামনবমীকে কেন্দ্র করে বেলাগাম বেজেছে মাইক, সাউন্ড বক্স। ধর্ম সেখানে গৌণ হয়ে গিয়েছে আর শব্দতাণ্ডব মুখ্য হয়ে উঠেছে। যা নিয়ে নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশই এদিন সমাজ মাধ্যমে ক্ষোভ জানিয়ে পোস্ট করেছেন। পরিবেশ কর্মীরা বলছেন, গত ১০ বছরে রাজ্যে মাইকের দাপট ক্রমশ লাগামছাড়া হয়ে উঠছে। রাতভর ম্যাটাডোরে করে সারিবদ্ধ ডিজের তাণ্ডব সভ্য সমাজের শেষ সীমাটি পর্যন্ত লঙ্ঘন করেছে।