রাজগঞ্জের অধুনা অপসারিত বিডিও প্রশান্ত বর্মণের গুণের কোনও ঘাট নেই। দুর্মুখ লোকের বলাবলি করে, তিনি নাকি সাদা খাতা জমা দিয়ে বিডিও হয়েছেন। পর্যবেক্ষক মহল কথা চালাচালি করে, তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের চোখের মণি ছিলেন তিনি। এলাকায় তাঁর দাপট, দ্বাপর যুগের অবতারের চেয়ে কোনও অংশে কম ছিল না। দীর্ঘদিনের ভাঙা রাস্তা মেরামতির দাবিতে বিক্ষোভকারী মহিলাদের উদ্দেশে তাঁকে উপদেশ দিতে শোনা গিয়েছিল, লক্ষ্মীর ভান্ডার নেওয়া বন্ধ করলেই সেই টাকাতে রাস্তা সারানো হবে।
এ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। কিন্তু বাগুইআটির স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুনের মামলায় যখন প্রশান্ত বর্মণের নাম জড়িয়ে গেল, তখনই শুরু হল সমস্যা। পর্যবেক্ষকরা কেউ কেউ বলেন, পঞ্চায়েত ভোটে তৃণমূলকে জেতানোর অলিখিত নির্দেশ পালন করতেন রাজ্যের বিডিও-রা। তাই, খপ করে গিয়ে প্রশান্তকে ধরে জেলে পুরে দিলে বিপদ। এমতাবস্থায়, ধরি মাছ না-ছুঁই পানি নীতিতে চলল নবান্ন। বিডিও পদ থেকে প্রশান্তকে অপসারণ করা হল ঠিকই। কিন্তু, ডব্লুবিসিএস আধিকারিক প্রশান্তের বিরুদ্ধে কোনও বিভাগীয় তদন্ত, সাসপেনশন, কিছুই হল না। এদিকে, বাগুইআটিতে স্বর্ণব্যবসায়ী খুনের মামলাতে তদন্ত শুরু করল বিধাননগর কমিশনারেট। এবং, চার্জশিটে প্রশান্তকে পলাতক (Absconding) দেখানো হল। এক আদালত থেকে অন্য আদালতে গিয়ে রক্ষাকবচ চাইলেন প্রশান্তর আইনজীবী। কিন্তু, পলাতক বিডিও-কে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিল আদালত। নিম্ন আদালত থেকে মামলা গড়াল হাইকোর্টে ও হাইকোর্টথ থেকে সুপ্রিম কোর্টে। কিন্তু তাতে কিছুই এসে গেল না লা-পাতা বিডিও-র।
এমতাবস্থায়, রাতে নিউটাউনের রাস্তায় মদ্যপ হয়ে বিলাসবহুল গাড়ি চালাতে গিয়ে এক পথচারীকে ধাক্কা মেরে ফের শিরোনামে এলেন রহস্যময় রাজকুমার। তিনি মদ খেয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলেন কি না, তা পরীক্ষা করতে তাঁকে একটি যন্ত্রের সামনে ফুঁ দিতে বলা হলে রীতিমতো হম্বিতম্বি শুরু করে দেন প্রশান্ত। এরপর তাঁকে আটক করা হয়। তারপর গ্রেফতার। কিন্তু, খুনের মামলায় পালিয়ে বেড়ানো বিডিও-কে আদালতে পেশ করা হলে বিচারক জামিন মঞ্জুর করেন!
এই ঘটনায়, গত ২৪ ঘণ্টায়, সমাজমাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বত্র নাগরিক সমাজ ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্ন তোলে, এ কেমন বিচারব্যবস্থা, এ কেমন আইনব্যবস্থা?
প্রসঙ্গত, আদালত চত্বরে সাংবাদিকরা প্রশান্তকে প্রশ্ন করলে একেবারে আস্তিন গুটিয়ে তেড়ে যাওয়ার উপক্রম করেন তিনি। এবং তারপরই লাখটাকার প্রশ্ন ওঠে, প্রশান্তর মাথায় কোন প্রভাবশালীর হাত রয়েছে?
সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, স্বর্ণবাবসায়ী খুনের মামলায় মূল অভিযুক্ত হলেও, চার্জশিট থেকে প্রশান্তর নাম বাদ দিয়েছিল সদ্য প্রাক্তন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের পুলিশ। এবং, পূর্বতন সরকারের সৌজন্যেই প্রশান্ত এত সহজে জামিন পেয়ে গেলেন বলে দাবি করছে আইনজীবী মহল।
টাইমলাইন
১. ৩০/১০/২৫ -এ বিধাননগর পুলিশের কাছে প্রশান্ত বর্মণকে দায়ী করে লিখিত অভিযোগ জমা করেন খুন হওয়া স্বর্ণব্যবসায়ীর আত্মীয়।
২. সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে অপসারিত বিডিও প্রশান্ত বর্মণের নামে এফআইআর করা হয়। তখন বারাসাত আদালতে গিয়ে আগাম জামিন নেন প্রশান্ত। ওই জামিনকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে যায় বিধাননগর পুলিশ।
৩. হাইকোর্ট গত বছর (২০২৫ সাল) ২২ ডিসেম্বর প্রশান্তর জামিন খারিজ করে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আত্মসমর্পণ করতে বলে।
৪. প্রশান্ত আত্মসমর্পণ না-করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। কিন্তু তাতে কোনও লাভ হয় না। গত ২৩ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টও প্রশান্তকে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেয়। এরপর, হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরও আত্মসমর্পণ না-করে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন এই অপসারিত বিডিও। এদিকে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের কয়েকদিন পরেই ৩১ জানুয়ারি স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুনের মামলায় চার্জশিট পেশ করে পুলিশ। তখন দেখা যায়, চার্জশিটে ৫ জনের নাম রয়েছে, কিন্তু প্রশান্তর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
রহস্যময় রাজকুমারের নাম কোন রহস্যে চার্জশিট থেকে বাদ গেল, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও আত্মসমর্পণ না-করে কেন পলাতক থাকলেন তিনি, কেনই-বা পুলিশ তাঁকে খুঁজে পেলো না, তার কোনও যুতসই যুক্তি খুঁজে পাওয়া গেল না আজও। ঠিক যেমন যু্তসই যুক্তি খুঁজে পাওয়া গেল না যে, পথচারীকে ধাক্কা মারার ঘটনায় গ্রেফতার হওয়ার পরও কীভাবে জামিন পেলেন প্রশান্ত।
মামলায় নাম জড়িয়েছে, কিন্তু চার্জশিটে নাম বাদ! এদিকে আবার পলাতক! দুঁদে আইনজীবীরাও এর ব্যাখ্যা দিতে পারবেন কি না সন্দেহ।