বামজমানার শেষের দিকে জমি আন্দোলনের গর্ভগৃহ হয়ে ওঠে সিঙ্গুর। জমি অধিগ্রহণকে ঘিরে শুরু হয় জোর আন্দোলন। অনিচ্ছুক কৃষকদের কাছে জোর করে জমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, এই অভিযোগকে সামনে রেখে সিঙ্গুরে গড়ে ওঠে কৃষিজমি রক্ষা কমিটি। ধর্মতলায় টানা ২৬ দিন অনশন করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্রাম থেকে শহর অবধি ছড়িয়ে পড়ে জমি আন্দোলনের আঁচ। এবং, যার পরিণতিতে, অর্ধনির্মিত কারখানা ফেলে সিঙ্গুর থেকে গুজরাতের সানন্দে ন্যানো কারখানা সরিয়ে নিয়ে যান রতন টাটা।
বাংলায় পালাবদল ও জমি-ফেরত
সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন কলকাতার রাজপথকেও উত্তপ্ত করে তোলে। এবং, তার জেরেই তৎকালীন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সরকারের পতন হয়। চৌত্রিশ বছরের বামজমানার অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় আসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল সরকার। প্রতিশ্রুতি মতো সিঙ্গুরের অনিচ্ছুক কৃষকদের জমি ফিরিয়ে দিতে আদালতে যায় এই পরিবর্তন-পরবর্তী সরকার। এবং আদালত থেকে জয় ছিনিয়ে নিয়ে জমি ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়। সর্ষের বীজ ছড়িয়ে সেই জমিকে চাষযোগ্য করার প্রতীকী বার্তা দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে।
না-হল শিল্প, না-হল কৃষি
জমি ফিরে পেলেও কৃষকরা কিন্তু আর সেই জমিতে চাষ করতে পারেন না। মুষ্টিমেয় কিছু জায়গাকে বাদ দিলে, সিঙ্গুরের উর্বর জমি কিন্তু বন্ধ্যা হয়ে যায়। অভিযোগ, সেই বন্ধ্যাত্ব কাটাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করে না। এমতাবস্থায়, একদা তৃণমূলনেত্রীর ছায়াসঙ্গী ও জমি আন্দোলনের অন্যতম মুখ দুধকুমার ধারা প্রকাশ্যে সরকারের উপর বিষোদগার করে গড়ে তোলেন 'বন্ধ্যা জমি পুনর্ব্যবহার কমিটি'। দেড়দশক আগে, বু্দ্ধদেব ভট্টাচার্যর জমানায় যে-বিতর্কে রাজ্যের নাগরিক সমাজ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে উঠেছিল, সেই বিতর্ক ফের সামনে আসে:কৃষি না শিল্প? এবং সেই সঙ্গে সিঙ্গুর আন্দোলনকারী কৃষক থেকে শুরু করে মাস্টারমশাই রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের মুখে আক্ষেপ শোনা যায়: না-হল শিল্প, না-হল কৃষি।
সিঙ্গুরে মোদী
একদা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে জমি আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন যাঁরা, তাঁদের অনেকেই আক্ষেপ করে বলতে থাকেন: টাটাকে তাড়ানো ভুল হয়েছিল। যাঁদের মধ্যে তৃণমূলের চাণক্য মুকুল রায় থেকে শুরু করে নন্দীগ্রামে ভূমি আন্দোলনের নেতা শুভেন্দু অধিকারীও ছিলেন। যদিও, তৃণমূল থেকে বিজেপিতে গিয়েই এহেন আত্ম-উপলব্ধি হয় তাঁদের। তবু, রাজ্যে শিল্পের প্রবল খরার মাঝে পর-পর জনসভায় সিঙ্গুর প্রসঙ্গ তুলে হাততালি কুড়োন শুভেন্দু। এমনকি, রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এলে ফের টাটাগোষ্ঠীকে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। এমতাবস্থায়, ছাব্বিশের মহা-ভোটের আবহে চলতি মাসের ১৮ তারিখ সিঙ্গুরে জনসভা করতে আসছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এবং, একদা সিঙ্গুরে জমি আন্দোলনের অন্যতম মুখ ও বর্তমানে তৃণমূলের 'প্রাক্তনী' দুধকুমার ধারা মোদীর কাছে আর্জি জানাতে তৈরি হচ্ছেন, "হয় বন্ধ্যাজমিকে চাষযোগ্য করে দিন, নয়তো শিল্প গড়ুন"।
'বন্ধ্যা জমি পুনর্ব্যবহার কমিটি'
সম্প্রতি, কিছুটা আচম্বিতেই সিঙ্গুরে গোটা পনেরো মাটি কাটার জেসিবি মেশিনের উপস্থিতি চোখে পড়েছে। 'বন্ধ্যা জমি পুনর্ব্যবহার কমিটি'র পক্ষ থেকে দুধকুমার ধারার দাবি, "দীর্ঘদিন চাষ করা যায়নি, জমি এখন আগাছায় পরিপূর্ণ। নরেন্দ্র মোদী এলে, চাষের জমির এই বেহাল অবস্থা দেখিয়ে তাঁর কাছে যেন কৃষকরা দরবার করতে না-পারেন, সেই লক্ষ্যেই জমি সাফ করার কাজ চলছে। তবে, আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে বলবো, হয় এই জমিকে চাষের যোগ্য করে তুলুন, নয়তো শিল্প গড়ুন"।
'বন্ধ্যা জমি পুনর্ব্যবহার কমিটি'র এই সক্রিয়তাই শাসকদলকে ভাবাচ্ছে বলে দাবি দুধকুমারের। এবং সেই কারণেই জমি থেকে 'আগাছা সাফ' করার কাজ শুরু হয়েছে। ওই কমিটির অন্যতম মুখ মহাদেব দাস বলেন, "এই জমি যদি চাষযোগ্য হয় ভালো। আর চাষযোগ্য না-হলে অন্য কোনও বিকল্প পথের সন্ধান দেওয়ার কথা বলবো নরেন্দ্র মোদীকে। কারণ তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী"। কমিটির দাবি, ১০ বছর পার হয়ে গেলেও সিঙ্গুরের প্রায় ৭০ শতাংশ জমি এখনও চাষযোগ্য হয়ে ওঠেনি। মোদী আসার আগে তাই বাজেমেলিয়ায় একহাত সমান ঝোপঝাড় সাফ করতে ১৫ টি মাটা কাটার যন্ত্রকে মাঠে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কী বলছে তৃণমূল?
যদিও স্থানীয় তৃণমূল নেতা অমিয় ধারা এই দাবিকে নস্যাৎ করে দিয়ে বলেন, "চাষযোগ্য করেই জমি ফেরত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কিছু কৃষক, যাঁরা নানা কারণে বাইরে রয়েছেন, তাঁরা আর চাষ করেননি। তাই কিছু জায়গা এমন নোংরা হয়ে পড়ে আছে। নরেন্দ্র মোদী আসছেন বলে আগাছা পরিষ্কার করা হচ্ছে, একেবারেই তা নয়। এটা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। তাছাড়া বছরের এই সময়টা খুব ভালো। বর্ষা-বৃষ্টির ব্যাপার নেই, শুকনো মাঠ। তাই আগাছা পরিষ্কার করে, জমির সীমানা নির্ধারণের কাজ যেটুকু বাকি আছে, তা সম্পূর্ণ করা হচ্ছে। যাতে করে কৃষকরা চাষের মরসুমে ফের চাষ করতে পারেন"।