'এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ তবু রঙ্গে ভরা'।
ঈশ্বর গুপ্ত নেই তো কী হয়েছে, বঙ্গদেশে এখনও রঙ্গ কিছু কম নেই। এবং সেই কারণে, "বাবা নেই তো কী হয়েছে, বাবার মতোই দেখি", তাই ভোটার তালিকায় নাম তুলতে 'মতো'-বাবাকেই 'বাবা' বানিয়ে দিলেন দেবীচরণ!
উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া থেকে এমনই কিছু রঙ্গের উপাদান পাওয়া গেল। এবং, এসআইআর নিয়ে টানটান উত্তেজনার আবহে তা খানিক কমিক রিলিফ দিল।
কে কার বাবা?
চোপড়া বিধানসভার সোনাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের হতদরিদ্র মানুষ চা-বাগানের কাজ করে দু-বেলা দু-মুঠো অন্ন সংস্থান করে। ঘরে টিনের চালের ফাঁকে ইতিউতি উঁকি মারে ইটের গাঁথুনি। সামনে কিছুটা ফাঁকা উঠোন। ওই উঠোনে বসেই হেসে উঠলেন নরেন সিংহ। তাঁকে শুধু প্রশ্ন করা হয়েছিল, "সে কী! কখন বাবা হয়ে গিয়েছেন তা নিজেই পারলেন না"?
রাজ্যে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনী অভিযান শুরু হওয়ার বৃদ্ধ জানতে পারলেন, তাঁকে বাবা বলে দাবি করে ভোটার তালিকায় নাম তুলেছে কেউ একজন। হাসির পর দুশ্চিন্তার বলিরেখা দেখা গেল বৃদ্ধের কপালে, “আমার দুই ছেলে, কিন্তু এসআইআর ফর্মে দেখা যাচ্ছে তিনজন! দেবীচরণ সিংহ নামে এক ব্যক্তি আমার ছেলের জায়গায় ভোটার তালিকায় ঢুকে পড়েছে।”
নরেন আর দেবীচরণের মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ নেই। ওই তল্লাটে গিয়ে দেখা গেল, এমন ঘটনা নাকি আকছার ঘটে চলেছে। জীতেন সিংহের অভিযোগ, তাঁর বাবাকে বাবা হিসেবে দেখিয়ে ভোটার তালিকায় নাম তুলেছেন জনৈক আনন্দ সিংহ। জীতেন বলছেন, “এখন তো বিজেপি সিএএ চালু করেছে। ওরা চাইলে নিজেরাই (এদেশে) থাকতে পারবে। আনন্দের উচিত নাম কাটানো”।
বোঝাই গেল, পিতাপুত্র-র নেপথ্যে রয়েছে ভারত-বাংলাদেশের কাঁটাতার। অবিভক্ত দিনাজপুরের (উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরের) সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত-কাঁটা খুবই বেশি। তাই, বাংলাদেশ থেকে এখানে এসে জ্ঞাতিগুষ্ঠির বাড়িতে ওঠা, গ্রাম-সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে ওঠার রেওয়াজ বহুদিনের। এবং, অভিযুক্ত ও অভিযোগকারী, দু-পক্ষের কথাতেই তা স্পষ্ট হয়ে গেল। অভিযুক্তরা কেউ কিন্তু অভিযোগকারীদের নথি জাল করেননি। বরং, এক পক্ষ অন্যের পক্ষের সম্মতিতেই নথি দেখিয়ে ভোটার তালিকায় নাম তুলেছে। দেবীচরণের স্ত্রী ববিতার দাবি, ওঁরা যখন এসেছিলেন, তখন এলাকার নেতারাই অতি সক্রিয় হয়ে তাঁদের নাম তুলেছিলেন ভোটার তালিকায়। সেইসঙ্গে তাঁর সতর্কবার্তা, নাম কাটা হলে হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেবেন তিনি।
একইরকম অভিযোগ-অনুযোগ শোনা যায় স্থানীয় বাসিন্দা শ্যামল সিংহের মুখেও। তাঁকে ‘বাবা’ দেখিয়ে নাকি দুই ব্যক্তি বছরকুড়ি আগে ভোটার তালিকায় নাম তুলেছিলেন। এসআইআর শুরু হওয়ার পর বিএলও ঘরে কড়া নাড়তেই হাটখোলা দরজা দিয়ে সব কারচুপি বেরিয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এই এলাকায় বুথে বুথে এমন অসংখ্য ভুয়ো ভোটারের নাম রয়েছে। এবং, এ বিষয়ে যেমন তৃণমূল জমানার অবদান রয়েছে, তেননই পূর্বতন বামজমানার অবদানও রয়েছে। অভিযুক্ত আনন্দ সিংহ জানান, “সিপিএম জমানায় আমার নাম তালিকায় উঠেছিল। কারও নথি চুরি করিনি। সবাই জানে কীভাবে নাম উঠেছিল”।
বোঝা গেল। নরেনকে হরেন বানিয়ে হরেনকে নরেন বানানোই এখানকার রেওয়াজ।