কলকাতা পুলিসের ডিসি শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের বাড়িতে ইডি-র তল্লাশি ও তারপর সিজিও-তে তাঁকে ও তাঁর দুই পুত্রকে তলব নিয়ে যখন রাজ্যের রাজনৈতিক শিবিরে শোরগোল পড়ে গেছে, তখন পোড় খাওয়া রাজনীতিক অধীর চৌধুরী কিন্তু বহরমপুর থেকে নির্লিপ্তভাবে মন্তব্য করলেন, এই ঘটনায় রাজ্য়ের শাসকদলের উপর কোনও চাপ পড়বে বলে তাঁর মনে হয় না!
'প্রভাবশালী' শান্তনু
রবিবার সকালে যখন কলকাতা পুলিসের ডিসি শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের বাড়িতে তল্লাশি অভিযান শুরু করল ইডি, রাজ্য রাজনীতির ভরকেন্দ্রে তখন যেন এক নিঃশব্দ বিস্ফোরণ হল। অবসরপ্রাপ্ত পুলিস কর্তাদের মতে, 'ওসি কালীঘাট' শান্তনু ছিলেন শাসকদলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের চোখের মণি। এবং, শোনা যায, ঊর্ধ্বতন পুলিস কর্তারাও নাকি শান্তনুকে সমঝে চলতেন। একুশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে পুলিস কর্মীদের সভা থেকে তাঁকে প্রকাশ্যে শাসকদলের হয়ে সওয়াল করতে দেখা গিয়েছিল। এবং, ওই সভায় শোনা গিয়েছিল, নন্দীগ্রামে লোডশেডিং করিয়েই শুভেন্দু অধিকারী পরাজিত করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এমতাবস্থায়, কলকাতা পুলিসের ইনস্পেক্টর পদ থেকে অ্যাসিসট্যান্ট কমিশনার হয়ে ডেপুটি কমিশনারের পদ অবধি উন্নতির সিঁড়িতে হাঁটতে বেশি সময় লাগেনি তাঁর। এবং, কার্যত নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়েই।
রবিবার সকাল থেকে রাত অবধি কেন্দ্রীয় বাহিনীকে নিয়ে তল্লাশি চালিয়েই শান্তনুকে রেহাই দেয়নি ইডি। সোমবার সিজিও কমপ্লেক্সে তলবও করা হয়েছে তাঁকে। নিজের আইনজীবীদের পাঠিয়ে এ-যাত্রা তলব এড়িয়েছেন শান্তনু ঠিকই। কিন্তু, কতদিন তিনি এড়িয়ে থাকতে পারবেন, তা নিয়ে ঘোর সংশয় সংশ্লিষ্ট মহলে। ব্যবসায়ী প্রোমোটার জয় কামদারকে জালে তুলে শান্তনুর সঙ্গে তাঁর লেনদেনের ইতিহাস-ভূগোল জেনে নিচ্ছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। শান্তনু, কামদার ও কুখ্যাত সোনা পাপ্পু, সব এক জালে জড়িয়ে যাচ্ছেন। ইডি-র হাতে এমন বিস্ফোরক তথ্য-প্রমাণ এসেছে যে, শান্তনুর দুই পুত্রকে পর্যন্ত তলব করা হয়েছে।
রবিবার শান্তনুর বাড়িতে তল্লাশি চলাকালীন কারুর নাম না-নিয়ে তারকেশ্বরের এক সভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলতে শোনা গিয়েছে, "আমার সিকিউরিটি দেখে যে, তার বাড়িও সকাল থেকে রেড করছে। তার মানে আপনারা কি আমায় খুন করতে চান? না হত্যা করতে চান? আমাকে খুন করলে যদি আপনারা বাংলা পান, চেষ্টা করে দেখুন না। সিপিএম আমলেও অনেকবার খুন করা চেষ্টা করা হয়েছে"।
অধীর কেন নির্লিপ্ত ?
এমতাবস্থায়, ভোটের ঠিক মুখেই, শান্তনু-কাণ্ডে রাজ্যের শাসকদলের উপর কোনও চাপ পড়বে না বলে মনে করছেন অধীর চৌধুরী!
কেন?
"তৃণমূলে মোটামুটি যারা মাথাতে আছে, বড় বড় পদে আছে, সকলেই তো কোনও না কোনও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। এদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। এটা আমরা শুনেই চলেছি, শুনেই চলেছি। তৃণমূলের নেতারা এটা জেনে নিয়েই দুর্নীতি করেছে, বেশি কিছু হলে, বড়জোর এক-আধবছর জেল খাটবো। তাই এতে শাসকদলের ওপর তেমন কোনও চাপ পড়বে বলে আমার মনে হয় না"।
প্রোমোটার ব্যবসায়ী জয় কামদাকে গ্রেফতার করে অনেক বেআইনি লেনদেনের হিসেব হাতে এসেছে ইডি-র। এমতাবস্থায় অধীরের মন্তব্য, "দুর্নীতি নিয়ে ইডির তদন্ত, ইডির দক্ষতা, সারা দেশ জুড়ে বহুল প্রচারিত। তাই ইডি কী করছে না-করছে, তা নিয়ে আমাদের জবাব দেওয়ার কিছু নেই। ইডি যেদিন অপরাধীকে ধরে সাজা দিতে পারবে, সেদিন প্রশ্ন করবেন, উত্তর দেবো। বরাবর ফেল করা স্টুডেন্ট ইডি"।
আইপ্যাক নিয়ে বিস্ফোরক অধীর
দিল্লি থেকে আইপ্যাক কর্তা ভিনেশ চাণ্ডেলের গ্রেফতারি ও বাকি কর্তাদে কার্যত পরিবার-পরিজনসহ তলব নিয়ে অধীরের মন্তব্য, " দেখুন, পশ্চিমবঙ্গে যা লুঠতরাজ হয়েছে, বালি থেকে, কয়লা থেকে, পাথর থেকে, সব ক্ষেত্রে সবকিছুর সঙ্গে কিন্তু আইপ্যাক জড়িত। পশ্চিমবঙ্গে যত রাজনৈতিক হিংসা, সাম্প্রদায়িক হিংসা হয়, সবকিছুর পিছনে আইপ্যাকের টিপস থাকে, পরামর্শ থাকে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, চব্বিশের লোকসভার আগে মুর্শিদাবাদে রামনবমীতে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ও তার প্রেক্ষিতে হুমায়ুন কবীররে কুখ্যাত মন্তব্য আদতে অধীরকে হারাতে আইপ্যাকের তৈরি চিত্রনাট্য অনুযায়ী হয়েছে বলেই দাবি করছেন অধীর।