ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনী অভিযান (এসআইআর) নিয়ে বাংলায় তখন নাজেহাল অবস্থা নির্বাচন কমিশনের। নিত্যদিন নিত্য-নিত্য সমস্যা, ওজর-অজুহাত, শাসকশিবিরের অহযোগিতা চলতেই থাকছে। এমতাবস্থায়, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার রাজ্যে একটি বিশেষ পর্যবেক্ষক দলকে পাঠান এবং তার মাথায় থাকেন সুব্রত গুপ্ত। বাকিটা ইতিহাস।
কিছুদিনের মধ্যেই কমিশন-সূত্রে জানা যায়, শুধু এসাইআর নয়, বাংলায় অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট সুনিশ্চিত করার অ-সম্ভবকে সম্ভব করার দায়িত্ব দেওয়া সুব্রত গুপ্তকে। দায়িত্ব দেন জ্ঞানেশ কুমার স্বয়ং। এবং, বাংলার সংসদীয় রাজনীতিতে ইতিহাস গড়ে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ এবার ভোট দেন নির্ভয়ে, নির্ভীক চিত্তে। সুব্রত গুপ্ত বলেছিলেন, 'বাংলার ভোট কালচার' পাল্টাবে এবার। যা শুনে কালীঘাট থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রীতিমমতো প্রতিক্রিয়া দিয়ে বলেছিলেন, ''উনি নিজের কালচার পাল্টান আগে''। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসেনি তাঁর। আক্ষরিক অর্থেই হাসিমুখে 'বাংলার ভোট কালচার' এমনই পাল্টে দিয়েছেন তিনি, যা অন্তত আগামী ৫০ বছর দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
এই প্রজন্মের তরুণদের মধ্যে প্রশ্ন ওঠে, কে এই সুব্রত গুপ্ত? এমন এক দক্ষ বাঙালি আমলাকে কেন তেমন কোনও দায়িত্বে দেখা গেল না তৃণমূল-জমানায়?
আমলা মহলে কান পাতলেই শোনা যায়, সুব্রত গুপ্ত অন্যধাতের মানুষ, অন্য ধাতুর মানুষ। এবং, তাঁর বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে-অভিযোগ করেন, সিঙ্গুরে গা-জোয়ারি জমি অধিগ্রহণের সময়ে তিনিই সংশ্লিষ্ট দফতরের আমলা ছিলেন, তা কিন্তু নির্জলা মিথ্যা ছাড়া আর কিছু নয়। টাটাদের ন্যানো কারখানার জন্য সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণ পর্ব শুরু হয় ২০০৬ সালে। এর তিনবছর পর, ২০০৯ সালে, সুব্রত গুপ্তকে রাজ্যের শিল্পোনয়ন নিগমের শীর্ষ-কর্তার পদে বসান বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। ততদিনে সিঙ্গুর থেকে ন্যানো কারখানা গুটিয়ে গুজরাতের সানন্দে নিয়ে গেছেন রতন টাটা।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে একপ্রকার করজোড়ে অনুরোধ করেছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, সিঙ্গুরে ন্যানো কারখানা করতে দিন, বাকি সব শর্ত মেনে নেওয়া হবে। কিন্তু, তা হয় না। এমতাবস্থায়, শিল্প-বিরোধী তকমা মুছে বাংলায় বিনিয়োগ আনতে বুদ্ধবাবুর শেষ ভরসা ছিলেন সুব্রত গুপ্ত। আইআইটি পাশ করে নেহাতই শখের বশে আইএএস পরীক্ষায় বসে দেশের মধ্যে চতুর্থ স্থান অধিকার করার ক্ষমতা রাখেন যিনি, তাঁকে ছাড়া আর কাকেই-বা ওই দুঃসময়ে ভরসা করবেন বুদ্ধবাবু?
দায়িত্ব পেয়ে তা পালন করার চেষ্টা করেছিলেন সুব্রত গুপ্ত। কিন্তু তখন রাজ্যে প্রবল সরকার বিরোধী হাওয়া, বুদ্ধ-বিরোধী হাওয়া। একদিকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে কলকাতার রাজপথ আন্দোলিত হচ্ছে। অন্যদিকে, জঙ্গলমহলের দখল নিয়েছে মাওবাদীরা, লালগড়ে শুরু হয়েছে প্রবল আন্দোলন। জিন্দালদের স্টিল কারখানার উদ্বোধন করে ফেরার পথে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কনভয়ে বিস্ফোরণ ও তার জেরে পুলিশি জেরা-জুলুমের অভিযোগ। ছত্রধর মাহাতোর বিরুদ্ধে রাজধানী এক্সপ্রেসের চালককে পণবন্দী করে রাখার অভিযোগ, 'ছত্র'ছায়ায় এসে মাওবাদীদের অন্তর্ঘাত ও তার জেরে জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেসের ভয়াবহ দুর্ঘটনা। সবমিলিয়ে, বাংলায় তখন শিল্প ও বিনিয়োগের পরিবেশ বা পরিস্থিতি কোনওটাই ছিল না। এমতাবস্থায়, হতাশ হতে হয় সুব্রত গুপ্তকে।
এরপর পালাবদল হয়। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য-ঘনিষ্ঠ দুঁদে আমলারা কেউ কেউ তখন নিজেদের পুনর্বাসনের বন্দোবস্ত করতে ঘাসফুল-ঘনিষ্ঠ লবির দ্বারস্থ হচ্ছেন। নইলে মাননীয়ার রোষানলে পড়তে হবে যে। যদিও, সুব্রত গুপ্ত কিন্তু সেই দলে ছিলেন না। টানটান শিরদাঁড়া ও কঠিনতম পরিস্থিতির মুখে ঠোঁটের কোণের হাসি যাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ, যাঁর দক্ষতা ও সততা প্রশ্নাতীত, তিনি কোন দুঃখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইয়েস ম্যান হতে যাবেন!
এখানেই শেষ নয়। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো প্রকল্প রূপায়ণের দায়িত্বে থাকার সময়ে তিনিই প্রথম সতর্ক করেন: রুট বদলাতে বিপর্যত অবশ্যম্ভাবী। প্রকল্পও পিছিয়ে যেতে পারে বছরদশেক। প্রসঙ্গত, ওই মেট্রো পথের যে-নকশা তৈরি হয়েছিল প্রথমে, তা বদলাতে বাধ্য করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। প্রযুক্তিবিদরা প্রমাদ গোনেন! অন্য রুট দিয়ে মেট্রোর লাইন গেলে তো সব কেঁচে গণ্ডুষ করতে হবে! প্রকল্পের খরচ বাড়বে, সময় বাড়বে। যে-এলাকায় সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ চলবে (বৌবাজার), সেখানে ধস নামলেও বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। এমতাবস্থায়, সুব্রত গুপ্ত রাজ্য প্রশাসনকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করলেন, অনুগ্রহ করে এই পথে যাবেন না, গেলে বিপদ অনিবার্য। যেমনটা ঠিক বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বলেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে, অনুগ্রহ করে সিঙ্গুরে কারখানাটা হতে দিন। কিন্তু সৎ পরামর্শ শোনা মাননীয়ার ধাতে নেই যে! ক্ষুদ্র রাজনীতির জন্য বৃহত্তর বিপর্যয় ডাকতে তিনি এতটুকু দ্বিধাবোধ করেন না যে!
এরপর ফিরহাদ হাকিম একবার তাঁর দফতরে সুব্রত গুপ্তকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেন ঠিকই। কিন্তু, কিছুদিনের মধ্যেই সমস্যা শুরু হয় মাননীয়ার মাননীয়া-সুলভ মনোজটিলতার কারণে। এরপর সুব্রত গুপ্ত ডেপুটেশনে কেন্দ্রীয় সরকারে যোগ দিতে চাইলে নানা ওজর-অছিলায় তা আটকে দেয় নবান্ন। একেবারে লাস্ট ইনিংসে সেই ছাড়পত্র পেয়ে দিল্লিতে ক্যাবিনেট সচিব হন সুব্রত গুপ্ত। যদিও, আমলা মহলে সবাই জানেন, রীতি ও নীতি মেনে রাজ্যের মুখ্যসচিব পদে বসার কথা ছিল তাঁর!
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, দিল্লি থেকে অবসর নিলেও সুব্রত গুপ্তের লাস্ট ইনিংস এখনও শেষ হয়নি। বাংলার সর্বাঙ্গীন উন্নয়ন এবং সেই সঙ্গে বিনিয়োগ ও শিল্পের পরিবেশ তৈরির জন্য দেড়দশক আগে যা করতে চেয়েছিলেন সুব্রত গুপ্ত, তা তিনি পারেননি। এবার, নতুন মুখ্যমন্ত্রীর মুখ্য উপদেষ্টার পদে বসতে তিনি রাজি হয়েছেন একটাই শর্তে, ২০০৯ সালে যা করতে পারেননি তিনি, ২০২৬-এ তা-ই করে দেখাবেন তিনি। নিজের জন্য নয়, পদের জন্য নয়, রাজ্যের জন্য, রাজ্যের তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের জন্য।