প্রথমে হাইকোর্ট। তারপর সুপ্রিম কোর্ট। তারপর ফের হাইকোর্ট। তারপর ফের সুপ্রিম কোর্ট। মাঝে, বাংলাদেশের একাধিক কোর্ট। অবশেষে মঙ্গলবার সোনালির চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণ করে দিল শীর্ষ আদালত। কেন্দ্রের আবেদন খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিল, বীরভূমের অন্তঃসত্ত্বা মহিলা সোনালি বিবিকে বাংলাদেশের জেল থেকে মুক্ত করে ভারতে ফেরাতেই হবে। এবং, এই মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের রায় বহাল রাখল শীর্ষ আদালত। এমনকি, দেশের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার আর্জি খারিজ করে স্পষ্ট বুঝিয়ে দেওয়া হল, এই মামলা আর দীর্ঘায়িত করতে চায় না শীর্ষ আদালত। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চে এদিন মামলা উঠলে সলিসিটর জেনারেল বলেন: আগামীকাল পর্যন্ত শুনানি মুলতুবি রাখা হোক, আমরা প্রস্তুত নই মামলার শুনানির জন্য। পাল্টা বিচারপতিরা বলেন: তালিকাভুক্ত না থাকলে আপনারা বলতেন তালিকায় নেই, এখন তালিকায় রয়েছে, তাতে আপনারা শুনানি করতে চাইছেন না।
কেন্দ্রের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ জানায়, সোনালি ও তাঁর পরিবার বেআইনি অনুপ্রবেশকারী হলে পরে খতিয়ে দেখা যাবে। কিন্তু জন্মের শংসাপত্র থেকে যা সব নথি সামনে আসছে, প্রমাণ হিসেবে তা যথেষ্ট জোরদার। মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী সোমবার।
সোনালি-মামলার 'শুরু' কোথায়?
আদতে বীরভূমের বাসিন্দা সোনালি, তাঁর স্বামী দানিশের সঙ্গে একরত্তি বাচ্চাকে কোলে করে 'ভিনরাজ্য' দিল্লিতে পাড়ি দেন রুজিরুটির তাগিতে। বয়স মাত্র ছাব্বিশ হলে কী হবে, পেটের দায়ে যাবতীয় সাধ-আহ্লাদ বিসর্জন দিতে হয়েছে সোনালিকে। যাইহোক, দিল্লিতে গিয়ে এই পরিযায়ী-পরিবার কাগজ-কুড়ানির কাজ করে দু-বেলা দু-মুঠোর বন্দোবস্তও করতে পারে কোনওরকমে। কিন্তু সেই 'সুখ' সয় না বেশিদিন। ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধনী অভিযান (SIR) নিয়ে বিতর্কের মাঝে বাংলাদেশি-পাকড়াও অভিযান শুরু হয় দেশজুড়ে। দিল্লির রোহিনী থেকে তাঁদের পাকড়াও করা হয় । বাংলায় কথা বলার 'অপরাধে', আধার কার্ড, ভোটার কার্ড এবং অনেক কাকুতি-মিনতি সত্ত্বেও তাঁদের 'বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী' বলে চিহ্নিত করে দিল্লি পুলিস। তারপর, অসমের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশে 'পুশব্যাক' করা হয় হয় তাঁদের। এদিকে, সে দেশের 'নাগরিক' না-হওয়ায় বাংলাদেশ সরকারও তাঁদের 'অনুপ্রবেশকারী' হিসেবে চিহ্নিত করে সোজা জেলে পুরে দেয়। এখন প্রশ্ন একটাই: আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা সোনালির শিশু সন্তান জন্ম নেবে কোন দেশে?
প্রসঙ্গত, শুধু সোনালি আর তাঁর স্বামী-পুত্রই নন, বীরভূমের দুটি পরিবারের ৬ জন এভাবে 'নেই মানুষের দেশে' চলে গিয়েছেন। যাদের মধ্যে ৬ বছরের শিশুও। অনেকটা সেই মালদহের কালিয়াচকের পরিবারের মতোই।
আদালতের কী নির্দেশ?
পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিক কল্যাণ পরিষদের উদ্যোগে কলকাতা হাইকোর্টে সোনালি ও তাঁর পরিবারের হয়ে একটি মামলা করা হয়। যেহেতু, এই সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানি সুপ্রিম কোর্টে হওয়ার কথা, তাই হাইকোর্ট সোনালির মামলা শুনতে চায়নি। এরপর, সুপ্রিম কোর্টে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে সওয়াল করেন আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ। সেই মামলার শুনানিতে বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী জানান, সোনালির মামলা শুনতে হাইকোর্টের কোনও বাধা নেই। এই মুহূর্তে কোথায় রয়েছেন সোনালি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা, তা নিয়ে হেবিয়াস কর্পাস করার মামলার শুনানি শুরু হয় কলকাতা হাইকোর্টে। আইনের পরিভাষায় হেবিয়াস কর্পাসের সহজ ব্যাখ্যা হল, কোনও ব্যক্তির সন্ধান না-পেয়ে যদি আদালতে মামলা করা হয়, তাহলে ওই ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হাজির করাতে হয় পুলিস-প্রশাসনকে। রাজনৈতিক বন্দিদের ভুয়ো সংঘর্ষে মেরে ফেলার অভিযোগ তুলে এই হেবিয়াস কর্পাস মামলার খবর মাঝেমধ্যেই সামনে আসে।
বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি ঋতব্রতকুমার মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চে সোনালি-মামলার শুনানি শুরু হয়। বিচারপতি চক্রবর্তী কেন্দ্রের উদ্দেশে প্রশ্ন করেন, আটক করার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কী করে সোনালি বিবি ও তাঁর পরিবারকে বাংলাদেশে পুশ ব্যাক করা হল? প্রসঙ্গত, ২৪ জুন ওই পরিবারকে দিল্লির রোহিনী থেকে আটক করা হয়। তার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ২৬ জুন সোনালির পরিবারকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে দাবি। ডিভিশন বেঞ্চের প্রশ্ন, নিয়ম না-মেনে এত তাড়াহুড়ো কারণ কী? কেন্দ্রের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল অশোক চক্রবর্তী সেদিন উপস্থিত ছিলেন আদালতে।
পরবর্তী শুনানির পর, ২৬ সেপ্টেম্বর সোনালির নাগরিকত্ব নিয়ে কার্যত নিঃশয় হয় হাইকোর্ট। এবং, ৪ সপ্তাহের মধ্যে সোনালি ও তাঁর পরিবার-পরিজনদেক ভারতে ফেরানোর নির্দেশ দেওয়া হয় কেন্দ্রীয় সরকারকে।
আদালত অবমাননা?
হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে স্পেশাল লিভ পিটিশন করার দৃষ্টান্ত কিছু কম নেই। কিন্তু, সোনালি-মামলায় এই লিভ পিটিশন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়। কার্যত হাইকোর্টের রায় মেনে নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার সোনালিকে ফেরত আনার চেষ্টা চালাচ্ছেন, এমনটাই মনে করা হয়েছিল। কিন্তু, বিষয়টি জিইয়ে রেখে, নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার মুখে কেন হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হল কেন্দ্র, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে আইনজ্ঞ মহলে।
মঙ্গলবার কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি ঋতব্রতকুমার মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চে কেন্দ্রের এই ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগও গ্রহণ করে হাইকোর্ট। এবং, ২৮ নভেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রকে তার বক্তব্য জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
অবশেষে 'সুপ্রিম'-ধমক?
সোনালি ও তাঁর পরিবার বেআইনি অনুপ্রবেশকারী হলে পরে খতিয়ে দেখা যাবে। কিন্তু জন্মের শংসাপত্র থেকে যা সব নথি সামনে আসছে, প্রমাণ হিসেবে তা যথেষ্ট জোরদার। তাই আগে তাঁদের ফিরিয়ে আনা হোক।