বিধানসভা হোক কি লোকসভা, যে কোনও সাধারণ নির্বাচনের আগে রাজ্যের শাসক ও বিরোধীর নজর থাকে মতুয়াগড়ের দিকে। পর্যবেক্ষকরা বলেন, শুধু উত্তর ২৪ পরগনা বা নদিয়া নয়, রাজ্যের একাধিক জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে মতুয়া-ভোটব্যাঙ্ক। এমনকি, রাজ্যের ৩০ থেকে ৩৫ টি বিধানসভা নির্বাচনে নির্ণায়ক ভূমিকা নেয় মতুয়া-ভোট।
এই পরিস্থিতিতে, ছাব্বিশের হাইভোল্টেজ ভোটের আগে মতুয়া ঠাকুরবাড়ি তেতে উঠবে, তা খুব স্বাভাবিক। তবে, এবার মতুয়াগড়ে শাসক-বিরোধীর রাজনৈতিক বিক্রিয়ায় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে এসআইআর। ওপার বাংলা থেকে আসা মতুয়া সমাজের অনেকের কাছেই যথাযথ নথি নেই। তাই ভোটার তালিকা থেকে নিজেদের নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কায় ভুগছেন অনেকেই। এই পরিস্থিতিতে, নির্বাচন কমিশন ও বিজেপিকে একই বন্ধনীতে ফেলে ক্রমাগত তোপ দেগেছে রাজ্যের শাসক শিবির। অন্যদিকে, গেরুয়া শিবির মতুয়াদের আশ্বস্ত করে সিএএ-শিবির খুলে বসেছেন। এমতাবস্থায়, মঙ্গলবার মতুয়াগড়ে মুখ্যমন্ত্রীর সভা রাজনৈতিক মহলের কাছে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
বনগাঁর ত্রিকোণ পার্কের সভাস্থল থেকে বিজেপিকে নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "(মতুয়া শংসাপত্রের নামে) আপনাদের সঙ্গে প্রতারণা করছে ওরা। ওই শংসাপত্র স্পষ্ট করে দিচ্ছে, আপনারা বাংলাদেশে ছিলেন। ২০২৫-এর নভেম্বর-ডিসেম্বরের শংসাপত্র। এদিকে ম্যাপিং করা হচ্ছে ২০০২-এর ভোটার তালিকার সঙ্গে। বৈধ ভোটাররা কেউ ভয় পাবেন না। আমি থাকতে কাউর গায়ে হাত তুলতে দেবো না। বিজেপি ভয় দেখিয়ে প্রচার করছে। বাংলাভাষায় কথা বললেই কি বাংলাদেশি"?
রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী পাল্টা বলেন, নরেন্দ্র মোদি ২০১৯ সালে ঠাকুরনগরে সভা করে বলেছিলেন মতুয়াদের নাগরিকত্ব দেওয়ার হবে। তিনি কথা রেখেছেন। সিএএ কার্যকর করেছেন। মতুয়ারা জানেন তাঁদের রক্ষাকর্তা নরেন্দ্র মোদী। সিএএ বিরোধিতার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষমতা চাওয়া উচিত। বীণাপাণি দেবীকে (বড়মা) চিকিৎসা করিয়েছেন বলে বারবার দাবি করছেন মুখ্যমন্ত্রী। আদতে ঠাকুরবাড়িকে অপমান করছেন। এর জন্য ক্ষমা চান মুখ্যমন্ত্রী। নির্বাচনে দেখা গিয়েছে ১০০ জন মতুয়ার মধ্যে ৯০ জন ভোট দেন বিজেপিকে। এবারও তা-ই হবে"।
শুভেন্দুর সংযোজন, "মুসলিম ভোট সরে যাচ্ছে, তাই সব গুলিয়ে দিতে চাইছেন মুখ্যমন্ত্রী । দক্ষিণবঙ্গের একটা বড় অংশের মুসলিম ভোট যাচ্ছে আইএসএফ-এর দিকে। শিক্ষিত ভোট যাচ্ছে বিজেপির দিকে। সীমান্তবর্তী মুসলিম ভোট যাচ্ছে আসাদউদ্দিন ওয়াইসি-র দল মিম-এর দিকে । (মতুয়াগড়ে) মিছিল করে কোনও লাভ হবে না"।
কোনদিকে ট্রেন্ড?
এসআইআর আবহে মতুয়া ঠাকুরবাড়িতে তৃণমূলের রাশ ক্রমশ আলগা হচ্ছে বলে মনে করছিলেন পর্যবেক্ষকরা। এবং তার একাধিক কারণও দেখিয়েছিলেন তাঁরা। প্রথম দিকে রাজ্যের শাসকদলের প্রবল গর্জনে মতুয়াদের অনেকেই আশ্বস্ত হয়েছিলেন: বাংলায় অন্তত এসআইআর হবে না, হলেও, নথিপত্র নিয়ে বেশি চিন্তা করতে হবে না। এমনকি, হুগলির একটি সভা থেকে মতুয়া শিবিরের ঘাসফুল-মুখ মমতাবালা ঠাকুর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন: বাংলায় এসআইআর হলে নেপালের মতো (জেন-জেড ও গণঅভ্যুত্থান) পরিস্থিতি হবে। এমন সব তর্জন-গর্জনের পর ছিটেফোঁটা বর্ষণও হল না। বাংলায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠল এসআইআর। এমতাবস্থায়, শাসকদলের প্রতি আস্থা হারাতে শুরু করল মতুয়াদের একটা বড় অংশ।
এই পরিস্থিতিতে, মতুয়া শিবিরের গেরুয়া-মুখ শান্তনু ঠাকুর সিএএ-তাস খেলতে শুরু করে দিলেন। উত্তর ২৪ পরগনার বিভিন্ন জায়গায় এক-এক করে সিএএ-সহায়তা শিবির তৈরি হল। মতুয়াদের আশ্বস্ত করে বলা হল, সিএএ-র মাধ্যমে একবার নাগরিক হয়ে গেলে এসআইআর-এ নাম থাকা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হবে না। এমতাবস্থায়, তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ মমতাবালা ঠাকুর তাঁর অনুগামীদের ধরে রাখতে কোন পথে হাঁটবেন, তা নিয়ে কিছুটা ধন্দেই পড়লেন। তারপর, ঠাকুরনগর থেকেই সাংবাদিক বৈঠক করে ঘোষণা করেন, আমরণ অনশনের বসবেন তিনি।
মমতাবালার বাড়ির সামনে ম্যারাপ বেঁধে অনশন মঞ্চ তৈরি হল। অনশন শুরু করল মমতাবালাপন্থী মতুয়া নেতৃত্ব। কিন্তু, প্রথম দিনেই মঞ্চের ধারের-পাশে দেখা গেলো না মমতাবালাকে। দূরভাষে প্রতিক্রিয়া দিয়ে জানালেন, জরুরি কাজে রাজ্যের বাইরে যেতে হয়েছে তাঁকে, দিনপাঁচেকের মধ্যেই ফিরবেন তিনি। তবে, ফিরেও তিনি অনশনে বসবেন কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করে বললেন, "পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেবো"।
সেই অনশন মঞ্চ থেকে অল ইন্ডিয়া মতুয়া মহা সংঘের সাধারণ সম্পাদক সুকেশ চৌধুরী তাঁর ক্ষোভ উগরে দিলেন। অনশনের সপ্তম দিনে, মমতাবালা শিবিরের মতুয়া-নেতা কোনও রাখঢাক না-করেই বললেন, "মতুয়াদের একটি অংশ তৃণমূলের সঙ্গে রয়েছে, একটি অংশ বিজেপির সঙ্গে রয়েছে। যে দুটি দল মতুয়াদের আশীর্বাদ নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও সদর্থক বার্তা পাইনি। তাদের কাছ থেকে কোনও ফোন বা বার্তা পাইনি। এমনকি, মিডিয়াতে তাদের কোনও বাইটও দেখা যায়নি। অত্যন্ত বেদনার বিষয়। কেউ পাশে থাকেনি। বরং কিছু থাকুক-না-থাকুক, আমরা পাশে পেয়েছি কংগ্রেস আর সিপিএমকে। তারা দুদিন আমাদের মঞ্চে এসেছেন। অন্যদিকে, ৭ দিন হয়ে গেল, যাদের আমরা ঘরের লোক মনে করতাম, যাদের নিজের মানুষ মনে করতাম, তারা কিন্তু কেউ আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি। না-তৃণমূল, না-বিজেপি, কেউ নয়"।
'গড়' হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, এই আশঙ্কা থেকে রবিবার আবেগঘন কণ্ঠে বক্তৃতা দিয়ে মমতাবালা বলে উঠলেন, "আমাদের রোহিঙ্গা বলা হচ্ছে"। মঞ্চে তখন রাজ্যের দুই মন্ত্রী, শশী পাঁজা ও ও স্নেহাশিস চক্রবর্তী। দাবি করা হয়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিনিধি হয়েই শশী ও স্নেহাশিস মতুয়াগড়ে গিয়েছেন। প্রসঙ্গত, কিছুদিন আগে এসআইআর-বিরোধিতা করে মতুয়াদের উদ্দেশে অভিষেককে বলতে শোনা যায়, "বিজেপির ফাঁদে পা ফেলে সিএএ-র পথে যাবেন না"।
একদিন বাদে, সোমবার অনশন তুলে নেওয়ার ঘোষণা করলেন মমতাবালা। যদিও, ততক্ষণে মঞ্চ প্রায় ফাঁকা। সংবাদমাধ্যম প্রশ্ন করল, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বার্তায় অনশন তুলে নিচ্ছেন? উত্তরে মমতাবালা বললেন, "সব দলের লোকেরাই আমাদের এখানে এসেছেন। তাঁদের সাধুবাদ জানাই। অভিষেকও বার্তা পাঠিয়েছেন। যাঁরা এসেছিলেন, সবারই একই চিন্তা। বিজেপি বাদে"।
ইতিমধ্যেই, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছে চিঠি লিখে মতুয়াদের নাগরিকত্ব সুনিশ্চিত করতে অর্ডিন্যান্স আনার অনুরোধ করেছেন কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা অধীর চৌধুরী। অনশন মঞ্চে গিয়ে মতুয়াদের পাশে দাঁড়িয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। সিপিআই(এম)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীও অনশন মঞ্চের অদূরে দাঁড়িয়ে মতুয়াদের পাশে থাকার অনুচ্চারিত বার্তা দিয়েছেন।