প্রশ্ন একটাই, দায় কার?
২৭ লক্ষের মধ্যে প্রথম দফায় পাশ করেছিলেন ১৩৬ জন মাত্র! দ্বিতীয় দফায় সেই সংখ্যা বেশ কিছুটা বেশি:১৪৬৮ জন। যদিও, লক্ষ ভোটারের মহাসিন্ধুতে তা বিন্দুমাত্র বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
কেন এই জটিলতা ?
বাংলার এসআইআর-পর্বের একেবারে শেষ দিকে রাজ্যের শাসক শিবির বনাম নির্বাচন কমিশনের মধ্যে পারস্পরিক আস্থাহীনতায়, 'অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অস্বাভাবিক রায়' দেয় সুপ্রিম কোর্ট। বিবেচনাধীন (UNDER ADJUDICATION) ৬০ লক্ষের মধ্যে কারা বৈধ ভোটার আর কারা নন, তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের। এবং, তাঁদের বিচার-বিবেচনায় ৬০ লক্ষের মধ্যে ২৭ লক্ষের নাম বাদ পড়েছিল। এমতাবস্থায়, রাজ্যের শাসক শিবির বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে রীতিমতো বিরক্ত হন দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। এবং, বাদ পড়া ২৭ লক্ষের ভোট-ভাগ্য চূড়ান্ত করার জন্য হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে ট্রাইবুনাল গঠনের নির্দেশিকা দেয় শীর্ষ আদালত।
পর্যবেক্ষকদের অনেকেই কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ঘাড়ে যাবতীয় দায় দায়িত্ব চাপিয়ে নিশ্চিত হতে চাইছেন না। তাঁদের বক্তব্য খুব স্পষ্ট, সুপ্রিম কোর্টে রাজ্যের শাসকশিবিরের মামলাতেই কিন্তু পুরো প্রক্রিয়া বিচারবিভাগের হাতে চলে যায়। খসড়া তালিকায় কমবেশি ১ কোটি ৩০ লক্ষ নাম লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি-র ক্যাটেগরিতে ছিল। কমিশন ও রাজ্যের আধিকারিকরা মিলে কিন্তু তার মধ্যে কমবেশি ৭০ লক্ষ নামের নিষ্পত্তি করেছিল। সুপ্রিম কোর্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সশরীরে সওয়াল ও তাঁর আইনজীবীদের সঙ্গে কমিশনের বাগবিতণ্ডার ফলেই কিন্তু প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের এজলাস বাদবাকি ৬০ লক্ষ নাম নিষ্পত্তির ভার বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের হাতে তুলে দেয়। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্ব তৈরি কমিটির হাতেই পুরো প্রক্রিয়া চলে যায়। কমিশনের আর কিছু করা থাকে না।
যে কারণে, রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে এই নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্ট জানান, " ট্রাইবুনাল আমার অধীনে কাজ করছে না। পুরোটাই বিচারবিভাগের হাতে। ওরা যখন যত নাম নিষ্পত্তি করবে তখন সেই মতো তালিকা প্রকাশ করতে প্রস্তুত আছি আমরা"। প্রসঙ্গত, বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী সম্প্রতি মন্তব্য করেন, "সবই চলছিল। হঠাৎ দেখলাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে সওয়াল করলেন আর পুরো ব্যাপারটা বিচারবিভাগের হাতে চলে গেল"।
'কমিশন কিন্তু কারুকে বিবেচনাধীন করেনি'
রাজ্যের শাসকশিবির কিন্তু এখনও নাম বাদ যাওয়ার দায় কমিশনের উপর চাপাচ্ছে। এমতাবস্থায়, 'অফেন্স ইজ দ্য বেস্ট ডিফেন্স' নীতিতে খেলতে শুরু করল কমিশনও। এদিন সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল বলেন, "আমরা কিন্তু কারুকে বিবেচনাধীন (UNDER ADJUDICATION) করিনি। রাজ্য সরকার, কিছু রাজনৈতিক দল, কিছু ব্যক্তি সুপ্রিম কোর্টে গেলেন। জানালেন, নির্বাচন কমিশনের উপর তাঁদের কোনও আস্থা নেই। অন্যদিকে, কমিশন বলল, রাজ্য সরকারের কাছ থেকে তারা প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোগত সহায়তা পাচ্ছে না। তখনই সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বিবেচনাধীন (UNDER ADJUDICATION) কথাটি এল এবং সেই বিবেচনার দায়িত্ব গেল বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের হাতে। ওই আধিকারিকরা ৬০ লক্ষের মধ্যে ৩৩ লক্ষকে বৈধ ভোটার হিসেবে গণ্য করলেন এবং ২৭ লক্ষ নাম বাদ গেল। আদালতের রায়েই এই ২৭ লক্ষ বৈধ না অবৈধ ভোটার, তার দায়িত্ব ট্রাইবুনালের হাতে গেল। ট্রাইবুনাল যতক্ষণ-না নাম দিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কিছু করার নেই। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট বলে দিয়েছে, আপিল ট্রাইবুনালের দায়িত্ব কমিশনের হাতে থাকবে না। এই বিবেচনাধীন (UNDER ADJUDICATION) বিষয়টি না-থাকলে এই পরিস্থিতি হত না। সে ক্ষেত্রে ইআরও কোনও নাম বাদ দিলে তা ডিইও-র কাছে আসত, ডিইও বাদ দিলে সিইও-র কাছে আসত। আদালতের নির্দেশ, কোনও সিভিল অফিসার এর মধ্যে যুক্ত থাকতে পারবেন না। একমাত্র জুডিশিয়ার অফিসাররা সিদ্ধান্ত নেবেন। ট্রাইবুনাল যখন যাঁদের ছাড় দেবে তখন তাঁরা ভোট দিতে পারবেন"।
কী বলছে এপিডিআর?
এপিডিআর-এর রঞ্জিৎ শূর অবশ্য নির্বাচন কমিশন ও তৃণমূলকে সমানভাবে দায়ী করছেন। তাঁর কথায়, "কোনও বড় রাজনৈতিক দল পুরোদস্তুর এসআইআর-এর বিরোধিতা করেনি। কংগ্রেস নয়, তৃণমূল নয়, সিপিআই(এম) নয়, এমনকি, অতিবাম সিপিআই(এমএল) লিবারেশনও নয়। এখন ভোটের আগে বাদ-পড়াদের নিয়ে হাওয়া গরম করছে সবাই। ২০০২ সালে নির্বাচন কমিশন কিন্তু এসআইআর করেনি। শুধু আইআর (ইনটেনসিভ রিভিশন) করেছিল। তথ্যের অধিকার আইনে সেবারের ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে কমিশনের কাছে চিঠি গেলে তারা নিরুত্তর থাকে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তাদের আর্কাইভ থেকে সেবারের নথিপত্র বার করে। দেখা যায়, এসআইআর নয়, শুধু আইআর। রাষ্ট্র ও কর্পোরেট শক্তি চাইছে, দেশের ১০ শতাংশ মানুষকে বেনাগরিক করে দিয়ে দাস-শ্রমিকে পরিণত করা। তাঁদের মধ্যে মুসলিমরা রয়েছেন, নিম্নবর্গের হিন্দুরা রয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে মুসলিমরা কেন দলেদলে ভারতে আসতে যাবেন? একেবারেই হতদরিদ্র কিছু মানুষ এখানে এসে রাস্তার ধারে ঝুপড়ি করে জঞ্জাল কুডনোর কাজ করেন ঠিকই। তবে সেই সংখ্য়াও হাতে গোনা। বাংলাদেশ থেকে হিন্দুরা চলে আসছেন এ-দেশে। তাহলে অনুপ্রবেশকারী বলে কাদের দাগিয়ে দিতে চাইছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার? ২০০৩ সালে যখন নাগরিকত্ব আইনের সংশোধন হয়, তখন 'অনুপ্রবেশকারী' শব্দটি আইনি বৈধতা পায়। তার আগে 'অনুপ্রবেশকারী' শব্দটাই ছিল না। আর, জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে এসআইআর বলেও কিছু ছিল না।"