'দুষ্টু লোকে'রা কি কলকাতার ভোটারদের 'ভ্যানিশ' করে দিল, নাকি, 'ভ্যানিশ' ভোটাররা ভোটের দিন 'দুষ্টুমি' করতো?
রাজ্যে যখন ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনী অভিযান মধ্যগগনে, তখন এমনই এক জটিল ধাঁধার মুখোমুখি নির্বাচন কমিশন। ব্যাকরণের পরিভাষায় যাকে বলা যেতে পারে: UNCOUNTABLE NOUN!
ধাঁধা?
অবশ্যই। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, শহর কলকাতায় ভোটদানের হার এমনিতে খুব-একটা বেশি নয়। অনেক ক্ষেত্রে তা ৬০ শতাংশেরও কম। যার অর্থ আর কিছুই না, ভোটের দিন বুথমুখী হওয়ার বদলে, ছুটি কাটিয়ে ভালোমন্দ খেয়ে দিবানিদ্রায় যান ভোটারদের একটা বড় অংশ। যদিও, জেলা সদর থেকে শুরু গ্রামেগঞ্জে কিন্তু ছবিটা একেবারেই অন্যরকম: ভোটের দিন বুথের সামনে দীর্ঘ লাইন, ছুটকো ঝুটঝামেলা, ছাপ্পা ভোট, কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে তর্কাতর্কি, বাগবিতণ্ডা, বিরোধী এজেন্টদের মেরে বুথ থেকে বের করে দেওয়া, এমনকি রক্তপাত ও প্রাণহানি।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, কলকাতায় যদি গড়ে ৬০ শতাংশ ভোট পড়ে, তাহলে সহজ পাটিগণিতের অঙ্ক অনুযায়ী, বাকি ৪০ শতাংশ ভোটারের নাম রয়েছে তালিকায়। ওই 'বাকি ৪০ শতাংশ' কি ভোটের দিন মধ্যাহ্নভোজন করে দিবানিদ্রায় যান, নাকি, তাঁদের কোনও 'অস্তিত্ব'ই নেই?
প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে বিএলও-দের সৌজন্যে। কমিশন-সূত্রে খবর, কলকাতায় ঝুপড়ি থেকে শুরু করে বহুতল পর্যন্ত, বহু ভোটারের কোনও খোঁজ খবরই পাওয়া যাচ্ছে না। তালাবন্ধ দরজার মুখোমুখি হয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে তাঁদের। এদিকে, নিয়ম অনুযায়ী, কাউর দরজায় তালা দেখলেই তাঁকে 'বাদ' দেওয়া যাচ্ছে না। আরও একবার কড়া নাড়তে সেই দরজার সামনে যেতে হচ্ছে। এবং, আরও একবার সেই বন্ধ দরজা বন্ধই থাকছে।
কলকাতার বাইরে রাজ্যের অন্য কোথাও এই সমস্যা যে নেই, তা কিন্তু নয়। কমিশন-সূত্র অনুযায়ী, রাজ্যে এই তালাবন্ধ ভোটার ৩০ শতাংশের আশেপাশে। কিন্তু, কলকাতায় তা কমবেশি ৫০ শতাংশ। কমিশনের পরিভাষায় এই ভোটাররা: UNCOUNTABLE! কিঞ্চিৎ রসবোধের পরিচয় দিয়ে কেউ কেউ আরও এক ধাপ এগিয়ে বলছেন :UNCOUNTABLE NOUN!
ষাট-সত্তর দশকে উত্তাল রাজনীতির সাক্ষী থেকেছে যে-কলকাতা, সেই শহরের নাগরিকরা কি রাজনীতিতে আগ্রহ হারিয়েছেন? প্রশ্ন উঠছে খুব স্বাভাবিকভাবেই। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, 'দুষ্টু লোকে'রা কি কলকাতার ভোটারদের 'ভ্যানিশ' করে দিল, নাকি, 'ভ্যানিশ' ভোটাররা ভোটের দিন 'দুষ্টুমি' করতো?
সহজ কথায়, তালিকায় নাম থাকা ভোটারদের একটা বড় অংশই স্থায়ীভাবে অন্য কোথাও চলে গিয়েছেন এবং অন্যত্র ভোটার তালিকায় তাঁদের নামও রয়েছে। কমিশন যাঁদের ডুপ্লিকেট ভোটার বলছে। এ ছাড়া, তালিকায় মৃত ভোটারের নামও কিছু কম নয়। এমনও কিছু ভোটার রয়েছেন, যাঁরা কখনও কর্মসূত্রে কলকাতায় ছিলেন, এখন আর নেই। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, 'দুষ্টু লোকে'রা তাদের সহজাত দক্ষতায় এইসব নাম তালিকায় রেখে দিয়েছে, যাতে করে হাজার-হাজার 'হাজরা'র মতো হাজার-হাজার ছাপ্পা মারা যায়।
ওয়াকিবহাল মহল বলছে, কলকাতার ভোটার তালিকা যদি যথাযথভাবে সংশোধন করা হয়, তাহলে দেখা যাবে, ভোটদানের হার যতটা কম বলে মনে হচ্ছে, তা কিন্তু নয়। পর্যবেক্ষকদের হিসেব মতো, ১০০ জনের মধ্যে ৫৫-৬০ জন ভোট দিচ্ছেন, এমনটা কিন্তু নয়। বরং, ১০০ জনের মধ্যে ৩০ জন 'অশরীরী ভোটার'কে বাদ দিলে সশরীরী ভোটারের সংখ্যা ৭০ জনে নেমে আসে। আদতে সেই ৭০ জনের মধ্যেই ৫৫-৬০ শতাংশ ভোটার ভোট দিচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে শতাংশের হিসেবে প্রকৃত ভোটদানের হার ৭০ শতাংশের বেশি বই কম নয়।
প্রসঙ্গত, এই 'অশরীরী ভোটার'দের সংখ্যা এত বেশি যে, 'ছাপ্পা' দিয়েও তার কূল-কিনারা খুঁজে পাওয়া যায় না। তাছাড়া, শহর কলকাতায় ছাপ্পার 'শতাংশ'ও জেলার তুলনায় কিছুটা কম।
তাহলে?
গণনা ফর্মের বিলি বন্দোবস্ত থেকে শুরু করে ভরতি ফর্ম সংগ্রহ করার কাজ এখন অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছে। সাড়ে ৫ কোটি ভোটারের ফর্ম ডিজিটাইজ করা হয়েছে। আর ক-দিন বাদেই সেই পর্ব প্রাথমিকভাবে শেষ হবে। তারপর প্রকাশিত হবে খসড়া তালিকা। যদিও, খসড়া প্রকাশিত হওয়ার পরও কেউ চাইলে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন যথাযথ নথি দিয়ে। এমনকি, যাঁদের নাম রয়েছে খসড়ায়, তাঁদের নাম নিয়ে আপত্তি তুলে বাদ দেওয়ার সুযোগও রয়েছে।
যদিও, আপাতত এই 'UNCOUNTABLE' NOUN নিয়ে কী করবেন বিএলও-রা, আর কতবার তালাবন্ধ ঘরে কড়া নাড়তে হবে তাঁদের, সেই প্রশ্ন কিন্তু মজা করে ফেলে দেওয়ার মতো নয়। কারণ, ভুলবশত যদি একজন 'বৈধ ভোটারে'র নামও বাদ যায় চূড়ান্ত তালিকায়, তাহলে ওই ভোটারের রাজনৈতিক ঠিকুজি-কুষ্ঠি দেখে, 'রং' বিচার করে, কমিশনের কাছে অভিযোগ জানাবে সংশ্লিষ্ট রঙের দল। আর সেই সঙ্গে, বিএলও-র উপর কমিশনের শাস্তির খাঁড়া নেমে আসবে অবধারিত ভাবে।
রগড়প্রিয় বাঙালি রগড় করে বলছে, অচিরেই নাকি হ্যাশট্যাগ নামছে: ভ্যানিশ ভোটার, দুষ্টু লোক, UNCOUNTABLE NOUN!