ছাব্বিশের হাইভোল্টেজ বিধানসভায় ভরত-রত্ন হুমায়ুন কাদের 'বি-টিম' হয়ে কাজ করে কাদের ভোট কাটবেন, তা নিয়ে জল্পনা অব্যাহত।
পর্যবেক্ষকরা কেউ কেউ মনে করছেন, বেলডাঙায় বাবরি মসজিদ 'পুনর্নিমার্ণে'র নেপথ্যে রয়েছে গেরুয়া শিবির। এবং হুমায়ুনের এই প্রকল্প আদতে 'বিজেপি-স্পনসর্ড'। বিজেপি-হুমায়ুনের এই রাজনৈতিক সমীকরণের অঙ্ক একেবারে কষে দেখিয়ে দিচ্ছেন তাঁরা। সেই সমীকরণ অনুযাযী, নতুন দল গড়ে রাজ্যের ১৩৫ টি আসনে প্রার্থী দেবেন বলে ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন হুমায়ুন। এমতাবস্থায়, মুর্শিদাবাদ ও মালদহে বিপর্যয়ের কালো মেঘ দেখছে তৃণমূল। গতবার মালদহের ১২ টি বিধানসভার মধ্যে ৮ টি ও মুর্শিদাবাদের ২২ টি বিধানসভার মধ্যে ২০ টি তে জয়ী হয়েছিল শাসক তৃণমূল। এই ৩৪ টি আসনকে পাখির চোখ করে ময়দানে নামবে বিজেপি-হুমায়ুন জুটি। একদিকে 'সাম্প্রদায়িক' হুমায়ুনকে হুঁশিয়ারি দেবে বিজেপি (যা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে, ব্যারাকপুরের অর্জুন সিংয়ের সৌজন্যে)। আর অন্যদিকে হুমায়ুন মাঠেঘাটে বলে বেড়াবেন তৃণমূল নেত্রীর সঙ্গে আরএসএস-এর 'নিবিড় সম্পর্কে'র কথা, দিঘার জগন্নাথ মন্দির, নিউটাউনে দুর্গাঙ্গন আর উত্তরবঙ্গে মহাকাল মন্দির তৈরির কথা। এতো মন্দির তৈরি হলে (বাবরি) মসজিদে কেন আপত্তি, সে কথাও।
এই পরিস্থিতিতে, নিজেদের অপবাদ ঘোচাতে শনিবার একেবারে মাঠে নেমে পড়েছে বিজেপি। দলের আইটি সেলের মাথা ও রাজ্যের কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক মনোজ মালব্য থেকে শুরু করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী নিশানা করেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। অন্যদিকে তৃণমূল বলছে 'বিজেপি-স্পনসর্ড'। আর বামেরা বলছে, পুরোটাই নাগপুর তথা আরএসএস-র চিত্রনাট্য অনুযায়ী হচ্ছে।
আগে বিজেপি-র কথায় আসা যাক। দলের আইটি সেলের মাথা ও বাংলার বিশেষ পর্যবেক্ষক অমিত মালব্য বলছেন, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগুন নিয়ে খেলছেন। 'সাসপেন্ড' হওয়া তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীরকে দিয়ে মুসলিম-আবেগ মেরুকরণ করে রাজনৈতিক ফায়দা লুঠতে চাইছেন তিনি। (বেলডাঙায় মসজিদের শিলান্যাস অনুষ্ঠানে) পশ্চিমবঙ্গ পুলিস নেপথ্য থেকে সাহায্য করছে। যাবতীয় নিরাপত্তা দিচ্ছে। ধর্মীয় কারণে স্পর্শকাতর এই অঞ্চলে কোনও সংগঠিত অশান্তির হলে থেকে ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে পড়তে পারে। উত্তরবঙ্গের সঙ্গে রাজ্যের বাকি অংশকে যুক্ত রাখে ওই সড়ক। এই মসজিদ তৈরির প্রকল্প আদতে কোনও ধর্মীয় কর্মসূচি নয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যা ধর্মীয় আবেগে আগুন লাগিয়ে (বিশেষ সম্প্রদায়ের) ভোট সংহত করার প্রচেষ্টা"।
রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কথায়, "যাঁরা ইসলাম মানেন তাঁরা মসজিদ বানাবেন, হিন্দুরা মন্দির বানাবেন, যাঁরা খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী তাঁরা গির্জা বানাবেন, শিখ যাঁরা তাঁরা গুরুদ্বার বানাবেন, তাতে কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু নামকরণে (বাবরি মসজিদ) আপত্তি আছে। মুঘল, পাঠানরা ভারত দখল করতে এসেছিল। অত্যাচার করেছে। জোর করে ধর্ম পরিবর্তন করেছে"।
বামেরা অবশ্য দাবি করছে, তৃণমূলের উপর ক্ষুব্ধ সংখ্যালঘু সমাজের একটা বড় অংশ। ওই বিক্ষুব্ধ-ভোট যাতে কোনওভাবে বাম-কংগ্রেসের ঘরে না-যায়, সেই লক্ষ্যেই হুমায়ুনকে মাঠে নামিয়েছে তৃণমূল। ২০২৩-এ সাগরদিঘির উপনির্বাচনে বাম সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী জয়ী হন। তার দু-বছর আগে ওই বিধানসভা কেন্দ্রে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূল প্রার্থী। বামেদের দাবি, বাংলায় তৃণমূল-বিজেপির বাইনারি যখন ভাঙছে, বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে বামেরা, তখন আরএসএস-এর সদর দফতর নাগপুর থেকে এই নাটক মঞ্চস্থ করা হচ্ছে।
সিপিআই(এম) নেত্রী গার্গী চট্টোপাধ্যায় সমাজমাধ্যমে লিখছেন, "ইচ্ছাকৃতভাবে নতুন দল খুলে বামেদের ভোট ভাঙানোর চেষ্টা চলছে। আরএসএস যখনই বোঝে বামেরা শক্তিশালী হয়ে উঠছে, তখন একটার পর একটা 'নতুন মুখ', 'নতুন দল' নামিয়ে দেয়। এটা বহু পুরনো কৌশল, নতুন কিছু নয়। এই রাজনীতিরই অংশ হিসেবে হুমায়ুন কবীরকে নিয়ে তৃণমূল তিনবার বহিষ্কারের নাটক করেছে। তবে ছবিটা আরও পরিষ্কার হয় যদি পুরো ইতিহাস দেখা যায়। বিজেপি একবার, কংগ্রেস দু-বার ওঁকে বহিষ্কার করেছিল। এক কথায়, এটা 'বহিষ্কারময় জীবন'। আর ক্ষমতাধরদের প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি হওয়া ভাঙন রাজনীতির এক পরিচিত চরিত্র"।