একই আদালত, একই এজলাস, একই বিচারক, একই নির্দেশ। তবু, বাদী ও বিবাদী দু-পক্ষই নিজেদের জয়ী বলে দাবি করছে! ভ্রান্তিবিলাস নয়তো?
বস্তুনিষ্ঠ সত্য বলিয়া কিছু হয় না
বস্তুনিষ্ঠ সত্য বা অবজেকটিভ ট্রুথ বলে যে আদতে কিছু হয় না, প্রতিটি ট্রুথ বা সত্যই যে আদতে নির্মাণ করা হয়, গত তিন-চারদশকে তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলেছে। বিজ্ঞানের সত্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন কার্ল সাগান। আবার জাঁক দেরিদা থেকে শুরু করে মিশেল ফুকোর মতো উত্তর আধুনিকতাবাদীরা ক্রমাগত বলে এসেছেন, একইসঙ্গে একই বিষয়ের পরস্পর-বিরোধী সত্য বিরাজ করতে পারে। প্রশ্ন উঠছে, রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল ও বিরোধী দল বিজেপি কি শেষ পর্যন্ত দেরিদা-ফুকো নিয়ে চর্চা শুরু করেছে? নইলে, এসআইআর ইস্যুতে কমিশনের ভূমিকা ও রাজ্যের নালিশ নিয়ে নিয়ে প্রধান বিচারপতি এজলাস যে-পর্যবেক্ষণ করেছে, নির্দেশ দিয়েছে, মৃদু ধমক দিয়েছে, প্রচ্ছন্ন অনুরোধ করেছে, তার মধ্যে কী করে একইসঙ্গে বাদী-বিবাদী দু-পক্ষই নিজেদের জয় দেখছে?
রাজ্য বনাম কমিশন
বলে রাখা ভালো, বিজেপির জয় বলতে এখানে কমিশনের জয়কেই বোঝানো হচ্ছে। কারণ, রাজ্যের শাসকদল নিরবিচ্ছিন্নভাবে অভিয়োগ করে চলেছে, নির্বাচন কমিশন আদতে বিজেপির দালাল। এমতাবস্থায় পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, কমিশনের জয় আদতে বিজেপিরও জয়, কমিশনের পরাজয়, বিজেপিরও পরাজয়। এবং একই যুক্তিতে, রাজ্যের জয় আদতে তৃণমূলের জয়, রাজ্যের পরাজয় তৃণমূলের পরাজয়।
দেশের শীর্ষ আদালতে রাজ্য বনাম কমিশনের দ্বৈরথ চলছে বেশ কয়েকমাস ধরে। তৃণণূলের জনপ্রতিনিধিরাও এই মামলার অংশ হয়েছেন। এবং সুপ্রিম কোর্টে সশরীরে সওয়াল করতে দেখা গিয়েছে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
রাজ্য ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাবে শেষ অবধি এক নজিরবিহীন পথ বাতলে দিয়েছে শীর্ষ আদালত: যে নাম নিয়ে সন্দেহ থাকছে, সেই নামের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করবেন নিম্ন আদালতের বিচারক তথা বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা। সেই মতো কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে একটি কমিটি তৈরি করেছেন। বিচারকরা প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। এমতাবস্থায়, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির এজলাসে গিয়ে রাজ্যের আইনজীবী কপিল সিব্বাল নালিশ করেন, বিচারকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে কমিশন, সেই সঙ্গে তাঁদের কানে মন্ত্রও দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনের কমিশনের বিরুদ্ধে ক্রমাগত নালিশ শুনতে-শুনতে তিতিবিরক্ত প্রধান বিচারপতি কপিলকে সোজা দরজা দেখিয়ে দেন। কিছুদিন বাদে, বাদ-যাওয়া ভোটাররা একটি মামলা করে, যার নেপথ্যে থাকে রাজ্য ও রাজ্যের শাসকদল। এদিন সেই মামলার শুনানি চলে। এবং, শুনানি শেষে তৃণমূল ও বিজেপি, দু-পক্ষই উচ্ছ্বসিত হয়!
কুণাল ঘোষ
তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সম্পাদক কুণাল ঘোষের কথায়, বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া ও হেনস্থা করা নিয়ে ভারতের নির্বাচন কমিশন ও তার স্বেচ্ছাচারী কমিশনার ভ্যানিশ কুমার, যা-যা অপকীর্তি করছিলেন, আজ সুপ্রিম কোর্ট তাতে হস্তক্ষেপ করে, নির্দেশ দিয়ে বুঝিয়ে দিল, পশ্চিমবঙ্গ সরকার বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার বাংলা থেকে যে-আপত্তি তুলেছে সেই আপত্তিকে তারা মান্যতা দিচ্ছে। যেমন, কারুকে যদি বাদ দিতে হয়, তাহলে তার নির্দিষ্ট কারণ জানাতে হবে কমিশনকে। এসআইআর নিষ্পত্তিতে ট্রাইবুনালের কথাও চলে এল। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে ট্রাইবুনাল তৈরি হতে পারে বলে জানাল সুপ্রিম কোর্ট। আদালত বুঝতে পারছে, নির্বাচন কমিশন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে বিজেপির শাখা-সংগঠনে পরিণত হয়েছে। সেই কারণেই বিচারবিভাগকে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। এবং ভোটার তালিকা সংক্রান্ত দায়িত্ব বিচারবিভাগকে হাতে তুলে নিতে হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ার নিয়েও সুপ্রিম কোর্ট লক্ষ্মণ রেখা টেনে দিয়েছে। হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি নির্দেশ ছাড়া, কথায়-কথায় হোয়াটসঅ্যাপ, ফতোয়া চলবে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি মতো, একজন বৈধ ভোটারের নামও যাতে বাদ না-যায়, সেই মর্মে নির্দেশ দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। ভোটের আগের দিন পর্যন্ত অ্যাডজুডিকেশনের কাজ চলবে। এটা নির্বাচন কমিশনের কাছে একটা বড় ধাক্কা। এবং, মানুষের স্বার্থরক্ষায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে-যে বিষয়কে তুলে ধরেছেন, সুপ্রিম কোর্ট আজ আবারও তাকে মান্যতা দিয়ে নির্বচন কমিশনের পক্ষপাতদুষ্ট কাজকে আরও ধাক্কা দিল।
তাপস রায়
এদিন বিজেপির দফতরে সাংবাদিক বৈঠক চলাকালীন আচমকা স্মার্টফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন, "একটু দাঁড়ান, আমি এটা বলে নিই। খুব দরকারি। সুপ্রিম কোর্ট দ্রুত সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছে। এসআইআর নিয়ে পিটিশনে বিরক্ত সুপ্রিম কোর্ট। রাজ্যের আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামীকে আবেদন ফিরিয়ে নিতে বললেন প্রধান বিচারপতি। ভোটের আগেই বিবেচনাধীনদের নাম নিয়ে নিষ্পত্তি হবে, আপনারা সিস্টেমে ভরসা রাখতে পারছেন না। আপনারা, মানে, রাজ্যের উদ্দেশে বলেছেন। বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের প্রশ্নের মুখে ফেলবেন না। দরকারে অবমাননার নোটিস জারি করতে পারি। রাজ্যকে বলেছেন প্রধান বিচারপতি"। এরপর তাঁর সংযোজন, "বেহায়ার নাহি লাজ নাহি অপমান"।
আদতে কী বলেছে সুপ্রিম কোর্ট
আইনজীবী মহলের একাংশ বলছে, কমিশনের উদ্দেশে কিছু নির্দেশ দিলেও, পুরো বিষয়টি কার্যত হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ও তাঁর তৈরি কমিটির হাতেই ছেড়ে দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। এবং সেই সঙ্গে যথেষ্ট বিরক্তি প্রকাশ করেছেন রাজ্যের উপর। এমতাবস্থায়, রাজ্যকে সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে ট্রাইবুনাল গঠন করার কথা বলেছেন তিনি। চাইলে সেই ট্রাইবুনালের দ্বারস্থ হতে পারে রাজ্য বা রাজ্যের শাসকদল, কোনও ব্যক্তিবিশেষ। বলাই বাহুল্য, ট্রাইবুনাল গঠিত হয়ে ৬০ লক্ষ বিবেচনাধীন নাম নিয়ে শুনানি চলবে এবং শেষ অবধি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে, এই বিষয়টি সম্পূর্ণ করতে ছাব্বিশের বিধানসভা পেরিয়ে একতিরিশের বিধানসভা ভোট চলে আসবে।