উনিশ শতকের কলকাতা, তখনও কলকাতা মোটর গাড়ির আমদানি হয়নি। সাহেব বাবু-বিবিরা ঘোড়া বা দুলকি চালের হাতির গাড়ি করে যাতায়াত করতেন। শুধু কলকাতা কেন, সময়টায় কোনো শহরেই মোটর চালিত যান ছিল না। সমাজের ধনী ব্যক্তিরা ঘোড়ার গাড়ি চড়লেও, কলকাতা শহরে তখন গরুর গাড়িও দেখা যেত। তবে মোটর যান আসার আগে অব্দি ঘোড়ার পিঠেই দৌড়েছে গোটা শহর। ল্যান্ডো, ফিটন বা পালকি গাড়ি,অশ্ব চালিত সেসব গাড়ির হরেক নাম। মধ্য যুগের শহর তার সংকীর্ণ রাস্তাঘাট ছেড়ে, প্রশস্ত পাকা রাস্তাঘাটের দিকে এগোচ্ছে, আর সাথে বেড়ে চলেছে ঘোড়ার পিঠে এই তিলোত্তমার গতি।
ছ্যাকরা গাড়ির নাম অনেকেই শুনেছেন। হুতোমী ভাষায় 'ছক্কড়-যুগ' বলা-ই যায়। শহরের রাস্তায় খটাখট দৌড়ে বেড়াত ছ্যাকরা। সাথে সদ্য পুরানো হয়ে যাওয়া পাল্কিও ছিল। রামমোহন, দ্বারকানাথ থেকে শুরু করে বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ সকলেই ছ্যাকরা গাড়ি আর পালকিতে ঘুরে বেরিয়েছেন। মজার জিনিস হল, এই জুড়িগাড়ি, ছ ঘুড়ি, ফিটন বা পালকি নিয়ে তাঁরা সমাজের দুর্নীতি, জড়তা, আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রচার করে গেছেন। ওয়েলেসলি, কর্ণওয়ালিসের সময়ে ঘোড়ার সাথে চলত হাতিও। সেই হাতি দেখে তেজি ঘোড়ার ভয় না পেলেও, দুর্বল ঘোড়া গুলি বড্ড ঘাবড়ে যেত। ১৮০৫ সালের 'বেঙ্গল হরকরা' পত্রিকায় এরকম একটি দুর্ঘটনার উল্লেখ আছে। মিস্টার হুটেম্যানের ঘোড়াটি একটি হাতি দেখে ঘাবড়ে গিয়ে ঢুকে গেল সোজা পচা নর্দমায়।
আঠারো শতকের মাঝামাঝি অব্দি শহরের গতি ছিল পালকির ঘাড়ে। শুধু তাই নয়, অশ্বযান ব্যয় বহুল হওয়ার কারণে বহুকাল অব্দি পালকি টিকে ছিল সাধারণের যাতায়তের অঙ্গ হয়ে। ঘোড়ায় টানা ট্রাম গাড়ি আসার পর থেকে সাধারণ মানুষের পালকি নির্ভরতা অনেকখানি কমে যায়। শহরে আসতে শুরু করল ওড়িয়া বেয়ারা-রা। তাদের পালকি ভাড়ার মূল্য ছিল মাত্র চার আনা। মজার জিনিস হল সেই সময়ে একটি ঘোড়ার পিঠে চড়ার মূল্য নির্ধারণ হত ৫ টাকা। অর্থাৎ তখন মানুষের থেকে পশুর মজুরির মূল্য ছিল অনেকটাই বেশি। আঠারো শতকের শেষ দিক থেকে ঘোড়া গাড়ির চল বাড়তে শুরু করলে, শহরে বাড়তে থাকে সাহেব কোচমেকারদের আনাগোনা। ওল্ড কোর্ট হাউস,ধর্মতলা, চাঁদনী এই সব অঞ্চলে ছিল কোচ তৈরির কারখানা। সঙ্গে বেড়ে ওঠে আড়গড়া-আস্তাবল-এর সংখ্যা। ১৯০১ সাল, তখন সবে কলকাতায় মোটর গাড়ি আসতে শুরু করেছে, কিন্তু এর মাঝেই ঘটে গেল এক অদ্ভুত কান্ড। গরুর গাড়ির ধাক্কায় শহরে প্রাণ হারালো এক সাত বছরে মেয়ে। কোর্টের দলিলে উল্লেখ আছে, Killed by a bullock cart: A bullock cart driver was charged yesterday before. Moulvi Buzlul Karim. Deputy Magistrate of Sealdah, with rash and negligent driving, thereby causing the death of a native girl of seven years. মজার বিষয় গাড়োয়ানটিকে, rash and negligent driving এর জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
১৮৯৭ সালে প্রথম মোটর গাড়ি চলার মাধ্যমে এখানেই ব্রিটিশ ভারতে মোটর যুগের সূচনা হয়েছিল। ১৯০৫ সালে শুরু হয়ে গেল ট্যাক্সি পরিষেবা। চৌরঙ্গী থেকে প্রথম ট্যাক্সি চলত ব্যারাকপুর, বজবজ, দমদম প্রভৃতি জায়গায়, ভাড়া ছিল মাইল প্রতি আট আনা। কলকাতায় প্রথম মোটর চালিত যাত্রীবাহী বাস চালু হয় ১৯২২ সালে। ১৮৭৮ সালে ট্রাম পরিবহনকে সম্পূর্ণভাবে চালাতে কোম্পানি গঠন করা হয় যার নাম হয় – “কলকাতা ট্রাম কোম্পানি”। এই ট্রামগুলো চালাত ঠান্ডা দেশের ঘোড়া, তাদের পক্ষে গরম কালে যাত্রী বোঝাই ট্রাম চালানো খুব কষ্টকর হয়ে পড়ত, ফলে অনেক ঘোড়া মারা যেতে লাগল। এই জন্যই ১৮৮২ সালে ট্রামকে পরীক্ষামূলক ভাবে স্টীমইঞ্জিন-এ চালানো হল। ১৮৯৬ সালে ফিলবার্ন কোম্পানি বৈদ্যুতিক ট্রাম চালানোর জন্য দরখাস্ত করে এবং তা সার্থক হয় ১৯০২ সালের মার্চ মাসে। খিদিরপুর লাইনে বৈদ্যুতিক ট্রাম চলে, এসপ্ল্যানেড থেকে খিদিরপুর ফার্স্ট ক্লাস-এ ভাড়া ছিল তখন ২ আনা।
যুগ বদলেছে, বদলেছে শহরের গতিবেগ। পালকি, জুড়ি গাড়ি পেরিয়ে হালের স্করপিও, তাল মিলিয়ে বদলেছে শহর কলকাতা। উনিশ শতক থেকে বর্তমান শহরের অর্থনীতি, পট পরিবর্তনে গতি এনেছে যান বাহন। তাই এই চলমান ইতিহাস শহর কলকাতার বিবর্তনের জ্যান্ত দলিল হয়ে রয়ে গেছে।