১৯০৫ সালের ১৯শে জুলাই বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব পাশ হয়ে গেল। ভাইসরয় লর্ড কার্জন বাংলাকে করলেন দুভাগ। তখন ইংরেজ বিরোধী শক্তির আঁতুরঘর হয়ে উঠেছিল বাংলা। আর সেটাই মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইংরেজদের কাছে। তাঁরা বুঝেছিলেন, বাংলাকে ভাগ না করতে পারলে বিদ্রোহের তীব্রতা কমানো এক প্রকার অসম্ভব। আর সেই বিষয়টা মাথায় রেখেই বাংলাকে ভাগ করে দেওয়া, বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা কে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ, আর অসম ও অধুনা বাংলাদেশ নিয়ে পূর্ব বঙ্গ। দূরদর্শী শাসক ইংরেজরা খুব সূক্ষ ভাবেই সমাজে পুঁতে দিয়েছিল ধর্মীয় বিভাজনের চারা। কিন্তু প্রতিবাদে গর্জে উঠল গোটা দেশ। বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব কার্যকর হবার আগেই ১৯০৫ সালের ৭ই জুলাই তারিখে সুরেন্দ্রনাথ তার 'দি বেঙ্গলী' পত্রিকার সম্পাদকীয়তে আসন্ন ঘটনাকে বলেছিলেন 'একটি ভয়ঙ্কর জাতীয় দুর্যোগ' এবং সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে সরকার যদি তার সিদ্ধান্ত না পাল্টায় তাহলে সামনে সর্বোচ্চ মাত্রার একটি জাতীয় প্রতিরোধ অপেক্ষমাণ রয়েছে'। বাস্তবে হলও তাই, স্বদেশী আন্দোলন থেকে, চরমপন্থী বিপ্লবী কার্যকলাপে দেশ তখন উত্তাল।
এই উত্তাল সময়ে কার্যকর হয়ে যায় বঙ্গভঙ্গ আইন, ১৯০৫, ১৬ই অক্টোবর, বাংলায় ১৩১২ বঙ্গাব্দ, ৩০শে আশ্বিন। বঙ্গভঙ্গের আইনের বিরুদ্ধে সকলকে একযোগে করে রুখে দাঁড়াতে শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শ্রী ভূপেন্দ্রনাথ বসু, শ্রী সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রী হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, শ্রী রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, শ্রী বিপিনচন্দ্র পাল ডাক দিয়েছিলেন ঐক্যবন্ধনের। ভোরবেলায় গঙ্গার ঘাটে পুণ্যস্নান সেরে, খালি পায়ে, এক বিরাট শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তাঁর হিল্লোলিত গৈরিক বসন আর দীপ্ত চাউনি যেন সেদিন সমস্ত বাংলার অবদমিত ক্ষোভ ও আশার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।গঙ্গার ঘাট থেকে শুরু করে কলকাতার রাজপথ ধরে এগিয়ে চলল সেই মিছিল। কবিগুরু লিখলেন — ‘ঈশ্বর যে বাঙালিকে বিচ্ছিন্ন করেন নাই তাহাই বিশেষরূপে স্মরণ এবং প্রচার করার জন্য সেইদিনকে আমরা ভাই এক ঠাঁই’। তিনি ঘোষণা করেন, ‘‘আজ হইতে বাংলাদেশের ঘরের মিলন এবং দেশের মিলন যেন এক উৎসবের মধ্যে আসিয়া সঙ্গত হয়। আজ হইতে প্রতি বৎসর এই দিনকে আমাদের জাতীয় সম্মিলনের এক মহাদিন বলিায়া গণ্য করিব।’’ সর্বনাশা ব্রিটিশ ষড়যন্ত্রের প্রতিরোধে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যের আহ্বান পৌঁছে দেওয়ার জন্য ‘‘বঙ্গচ্ছেদে রাখিবন্ধন’’ শীর্ষক একটি ইশ্তেহার সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল; তাতে স্বাক্ষরকারী ছিলেন কবিগুরু নিজে, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, ভূপেন্দ্রনাথ বসু, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও বিপিনচন্দ্র পাল। শুধু এঁরাই নয়, স্যার আব্দুল হালিম গজনবী, আব্দুল রসুল, বাবা কুয়ার সিং প্রমুখ বহু বিশিষ্ট সংখ্যালঘু নেতা ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নিতে আহ্বান জানান। গান গাইতে গাইতে রাস্তা দিয়ে মিছিল চলল— বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল—পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান ॥ এই যাত্রার সবচেয়ে আবেগঘন এবং ঐতিহাসিক মুহূর্তটি তৈরি হল, যখন কবি সদলবলে কলকাতার চিৎপুরের নাখোদা মসজিদে প্রবেশ করলেন। কোনও দ্বিধা বা জড়তা ছাড়াই তিনি সেখানে উপস্থিত মুসলিম ভাই ও মৌলবীদের হাতে রাখী পরিয়ে দিলেন। সেই দৃশ্যটি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের গালে এক বিরাট চপেটাঘাত, যা ধর্মের দেয়াল ভেঙে এক অখণ্ড বাঙালি সত্তাকে জাগিয়ে তুলেছিল।
অবন ঠাকুরের কথায়, "ঘাটে সকাল থেকে লোকে লোকারণ্য, রবিকাকাকে দেখবার জন্য আমাদের চার দিকে ভিড় জমে গেল। স্নান সারা হল— সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল এক গাদা রাখি। সবাই এ ওঁর হাতে রাখি পরালুম। অন্যরা যারা কাছাকাছি ছিল তাদেরও রাখি পরানো হল। হাতের কাছে ছেলেমেয়ে যাকে পাওয়া যাচ্ছে, কেউ বাদ পড়ছে না, সবাইকে রাখি পরানো হচ্ছে। গঙ্গার ঘাটে সে এক ব্যাপার। পাথুরেঘাটা দিয়ে আসছি, দেখি বীরু মল্লিকের আস্তাবলে কতকগুলো সহিসকে হাতে রাখি পরিয়ে দিলেন রবিকাকা। রাখি পরিয়ে আবার কোলাকুলি, সহিসগুলো তো হতভম্ব। হঠাৎই রবিকাকার খেয়াল গেল চিৎপুরের বড়ো মসজিদে গিয়ে সবাইকে রাখি পরাবেন। হুকুম হল, চলো সব। রওনা হলুম সবাই। গেলুম মসজিদের ভিতরে, মৌলবীদের হাতে রাখি পরিয়ে দিলুম। ওরা একটু হাসলে মাত্র।"
আজ রাখী-পূর্ণিমা। যদিও সেই ১৬ই অক্টোবরের রাখী বন্ধন উৎসবের সাথে আজকের দিনের কোনো যোগসূত্র নেই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ পেরেছিলেন, সাধারণ একটা সুতো দিয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক ছাদের তলায় রাখতে। আজকের দিনটি কি আমাদের কাছে শুধুই একটি 'উৎসব'? নাকি আমরাও পারবো ধর্মকে সরিয়ে রেখে সৌভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির বার্তা দিতে?