বিভূতিভূষণের ‘তালনবমী’, ভাদ্রের আকাশ ভেঙে নামা অঝোর ধারার বৃষ্টি, মেঠো পথের কাদা, আর বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে উঁকি দেওয়া তালগাছ— এই চেনা রূপেই বন্দি গ্রামীণ বাংলার এক শাশ্বত বর্ষাকাল। কিন্তু এই বর্ষা সবার জন্য সমান আনন্দের নয়। কারোর কাছে তা সর্ষে ইলিশের উৎসব, আর কারোর কাছে তা ঘরের ভাঙা চাল চুইয়ে পড়া জল আর জঠরাগ্নির তীব্র লড়াই। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমর ছোটগল্প ‘তালনবমী’ কেবল একটি তিথির বা ব্রতের গল্প নয়; এটি আসলে গ্রামীণ দারিদ্র্যের পটভূমিতে এক শিশুর অবোধ আকাঙ্ক্ষা আর তীব্র মনস্তাত্ত্বিক বেদনার এক কালজয়ী আলেখ্য।
গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে ক্ষুদে বালক গোপাল। ভাদ্রের গুমোট গরমে আর বর্ষার স্যাঁতসেঁতে দিনে যখন ঘরে চাল বাড়ন্ত, তখন তার অবুঝ মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে তালের পিঠে, পায়েস আর বড়া খাওয়ার জন্য। কিন্তু অভাবের সংসারে তাল কেনার পয়সা কোথায়? গ্রামের ধনী মুখুজ্জে বাড়িতে তালনবমী ব্রত উপলক্ষে এলাহী আয়োজন চলছে। গোপালের মনে আশা জাগে, মুখুজ্জে মশাইয়েরা তাকেও বুঝি নিমন্ত্রণ করবেন। সেই আশায়, তীব্র বর্ষার মধ্যে জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে আনা কালো কুচকুচে একজোড়া তাল সে মুখুজ্জে বাড়িতে বিনা পয়সায় দিয়ে আসে— যদি এই উপকারের বদলে একটি নিমন্ত্রণ জোটে !
বিভূতিভূষণ এই গল্পে মানুষের মনের স্বার্থপরতা ও শ্রেণীবিভেদকে ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে। মুখুজ্জে বাড়ির জাঁকজমক, গ্রামের অন্যান্য ছেলেদের নিমন্ত্রণ পাওয়া, আর অন্যদিকে গোপালের অধীর প্রতীক্ষা— এই দুইয়ের বৈপরীত্য,পাঠককে এক অদ্ভুত বিষাদে আচ্ছন্ন করে। গল্পের চূড়ান্ত মুহূর্তটি আসে গোপালের একটি স্বপ্নের মধ্য দিয়ে। সে স্বপ্নে দেখে, সে মুখুজ্জে বাড়ির মণ্ডপে বসে তৃপ্তি করে গরম-গরম তালের বড়া খাচ্ছে। কিন্তু ঘুম ভাঙতেই বাস্তব তাকে আছাড় মারে। বাইরে তখনো একনাগাড়ে বৃষ্টি পড়ছে, আর কান পাতলে শোনা যাচ্ছে মুখুজ্জে বাড়ির থালা-বাসনের শব্দ। গ্রামের সব শিশু-কিশোর নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে চলল, কেবল বাদ পড়ে রইল হতদরিদ্র ক্ষুদিরাম ভট্টাচার্যের দুই ছেলে— নেপাল আর গোপাল।
বিভূতিভূষণের লেখনীর ম্যাজিক এখানেই। তিনি কোনো চিৎকার বা বিদ্রোহের আশ্রয় নেননি। খুব শান্ত, মরমী ভাষায় তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে সমাজের অবহেলা একটি শিশুর সরল বিশ্বাসকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। ‘তালনবমী’ তাই কেবল একটি সাহিত্যকর্ম নয়, এটি আমাদের সমাজব্যবস্থার আয়না, যা শত বছর পরেও পাঠককে সমানভাবে আপ্লুত ও লজ্জিত করে। গল্পটি কেবল দুই ভাই নেপাল ও গোপালের পেটের ক্ষুধার গল্প নয়, এটি গ্রামীণ সমাজের নির্মম বৈষম্য ও অন্তরের হাহাকারের এক নিখুঁত দলিল। ভাদ্র মাসের ঝমঝমে বৃষ্টির মধ্যে ক্ষুধার্ত শিশুর আকুতি এবং অবস্থাপন্ন মানুষদের উদাসীনতা লেখকের সাবলীল জাদুকরী হাসিকান্নার ছন্দে ফুটে উঠেছে। প্রকৃতির স্নিগ্ধ রূপের আড়ালে মানুষের লোভ, নিষ্ঠুরতা এবং বেঁচে থাকার অন্তহীন লড়াইয়ের এক মর্মস্পর্শী সমাপ্তি ঘটেছে এই গল্পে, যা পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী রেখাপাত করে। বর্ষার মেঘলা দিনে গোপালের সেই উদাস চাউনি আর না-পাওয়া তালের বড়ার গন্ধ আজও বাংলা সাহিত্যের আকাশে এক চিরন্তন দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঘুরে বেড়ায়।