সুস্মৃতি দাস : মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, ভ্রাতা গিরীন্দ্রনাথকে নিয়ে ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করলেও জোড়াসাঁকো বাড়িতে কিন্তু চিরাচরিত হিন্দু প্রথা অনুযায়ী পূজা অর্চনা অব্যাহত ছিল। ইতিমধ্যে ১৮৪৬ সালে বিলাতে পিতা দ্বারকানাথের মৃত্যু হলে পিতার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান এর বিষয়টি দেবেন্দ্রনাথের কাছে এক মানসিক সংকট হিসাবে দেখা দেয়। তিনি পিতৃশ্রাদ্ধ এর সময় শালগ্রাম এনে শাস্ত্র বিধি অনুযায়ী শ্রাদ্ধ করতে সম্মত হলেন না। তিনি ' পৌত্তলিকতার সংশ্রববর্জিত দান উৎসবের একটি মন্ত্র ' উচ্চারণ করে দান সামগ্রী উৎসর্গ করলেন। এর ফলে তাঁর বিশুদ্ধ আত্মীয়রা সামাজিক ভাবে তাঁকে পরিত্যাগ করলেন। অবশ্য গিরীন্দ্রনাথ শাস্ত্র অনুযায়ী শ্রাদ্ধ ক্রিয়া সম্পন্ন করেন।
অপরদিকে ব্রাহ্ম সমাজ ও তত্ত্ববোধিনী সভার কাজে দেবেন্দ্রনাথ ক্রমেই এতবেশি জড়িত হয়ে পড়েছিলেন যে, বৈষয়িক কাজ কর্মে তিনি যথেষ্ট মনোযোগ করতে পারতেন না। দ্বারকানাথের উইল অনুযায়ী দেবেন্দ্রনাথ কার- ঠাকুর কোম্পানির যে আট আনা অংশ পান, তা তিন ভাইয়ে সমান ভাগ করে নেন। গিরীন্দ্রনাথ বিষয়বুদ্ধি সম্পন্ন ছিলেন। তাই ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্ব গিরীন্দ্রনাথই গ্রহণ করেন। দেবেন্দ্রনাথ বেদ চর্চা করতে কাশী তে চলে যান এবং ধর্মালোচনায় সম্পূর্ণ নিবিষ্ট হওয়ার সুযোগ পান তিনি। কিন্তু পরবর্তীতে তাঁর ধর্মমতের পরিবর্তন হয়। পূর্বে তিনি বেদ কে অভ্রান্ত মনে করতেন কিন্তু বেদ চর্চার ফলে তাতে বহু দেবতা, যজ্ঞের বাহুল্য ইত্যাদি দেখে ওই মত্ পরিত্যাগ করেন। উপনিষদের অদৈত্ববাদী ব্যাখ্যাও তাঁর অন্তরে সায় পায় না।
জানা যায় যে,জোড়াসাঁকো বাড়িতে দুর্গাপূজার সময় তিনি বাড়িতে না থেকে বিভিন্ন দেশ পর্যটনে ব্যাপৃত হতেন। এই ভাবে ১৮৪৯ এ আসাম, ১৮৫০ এ ব্রহ্মদেশ,১৮৫৬ এ কাশী, এলাহাবাদ, দিল্লী , আগ্রা , লাহোর ,মথুরা , বৃন্দাবন , সিমলা, প্রভৃতি স্থান ভ্রমণ করেন। সিমলায় অবস্থান কালে সিপাহী বিদ্রোহ শুরু হয়। দেবেন্দ্রনাথ তখন হিমালয়ের আরো গভীরে ভ্রমণ করেন। যা তাঁর আধ্যাত্মিক উপলব্ধির দিক দিয়ে যথেষ্ট মূল্যবান। অবশেষে ১৮৫৮ সালে ১৫ ই নভেম্বর তিনি কলকাতা প্রত্যাবর্তন করে।