Calcutta Television Network

'রাজসূয়' থেকে সর্বজনীন, কলকাতার বারোয়ারি দুর্গাপূজার দুই শতকের ইতিহাস

'রাজসূয়' থেকে সর্বজনীন, কলকাতার বারোয়ারি দুর্গাপূজার দুই শতকের ইতিহাস

24 August 2026 , 03:40:04 pm

কথায় আছে, দুর্গাপূজা রাজসূয় যজ্ঞের সমান। এই পূজার নিয়ম-আচার থেকে শুরু করে প্রতিটা আয়োজন-ই যথেষ্ট ব্যয়বহুল। তাই দুর্গাপূজা সীমাবদ্ধ ছিল রাজবাড়ির অন্দর মহলে। কলকাতার প্রথম দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের ঠাকুর দালানে, সালটা ১৬১০। তবে একসময় যে উৎসব ছিল কেবলই রাজা আর বনেদি বাবুদের অন্দরমহলের প্রতিপত্তি প্রদর্শনের মাধ্যম, সময়ের হাত ধরে তা আজ পরিণত হয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ উৎসবে। কলকাতার দুর্গাপূজা আজ আর কেবল ধর্মীয় আচার বা উপাসনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন এক বিশাল সাংস্কৃতিক কোলাজ। বনেদি বাড়ির রাজকীয় চৌহদ্দি থেকে পূজাকে আমজনতার দোরগোড়ায় এনে দাঁড় করানোর যে ঐতিহাসিক বিবর্তন, তার নেপথ্যে রয়েছে 'বারোয়ারি' বা 'সর্বজনীন' সংস্কৃতির এক অনন্য ইতিহাস।

'বারোয়ারি' শব্দটির উৎপত্তি মূলত ফার্সি এবং বাংলা শব্দের মেলবন্ধনে। 'বারো' (১২) এবং 'ইয়ার' (বন্ধু) — এই দুই শব্দ মিলে তৈরি হয়েছে 'বারোয়ারি', যার আক্ষরিক অর্থ বারোজন বন্ধুর যৌথ উদ্যোগ। ইতিহাসের পাতা ঘাটলে পাওয়া যায়, কলকাতার বুকে বারোয়ারি পূজার জন্ম হওয়ার অনেক আগেই এর সলতে পাকানো হয়েছিল হুগলি জেলায়। ১৭৯০ সালে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় এক বনেদি বাড়ির পূজা দেখতে গিয়ে একদল স্থানীয় মানুষ চরম অপমানিত হন এবং তাঁদের পূজামণ্ডপে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। এই অপমানের জবাব দিতেই ১৭৯৪ সালে (মতান্তরে ১৭৯০ সালে) ১২ জন স্থানীয় ব্রাহ্মণ বন্ধু মিলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদা তুলে একটি বিকল্প পূজার আয়োজন করেন। এটিই ছিল বাংলার ইতিহাসের প্রথম 'বারোয়ারি পূজা'।

গুপ্তিপাড়ার এই নতুন ধারা কলকাতায় আসতে সময় নিয়েছিল এক শতাব্দীরও বেশি। বিংশ শতকের শুরুতে কলকাতায় যখন মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, তখন বনেদি বাড়ির পূজায় সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল নিয়ন্ত্রিত। এই সামাজিক বৈষম্য ঘোচাতে ১৯১০ সালে দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর অঞ্চলের বলরাম বোস ঘাট রোডে প্রথম বারোয়ারি দুর্গাপূজার সূচনা হয়। স্থানীয় যুবকদের একাংশ ও সাধারণ মানুষের যৌথ অর্থানুকূল্যে এবং সক্রিয় অংশগ্রহণে এই পূজা আয়োজিত হয়েছিল। এই পূজার পালে আরও বেশি করে হাওয়া দিল জাতীয়তাবাদী চিন্তা ভাবনা। উল্ল্যেখ এই পূজাকে কেন্দ্র করেই মাতৃ-আরাধনার সঙ্গে চলত দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করার প্রয়াস। এই পূজার উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন অনেকেই স্বাধীনতা সংগ্রামী। বাবু কালচারের একচ্ছত্র আধিপত্যের দেওয়ালে সেটিই ছিল প্রথম আঘাত। ঠিক এর পরের বছর মানে ১৯১১ সালে, উত্তর কলকাতার রামধন মিত্র লেনে, ফণী মিত্র, মণি মিত্র, সত্যচরণ দাস প্রমুখের উদ্যোগে উত্তর কলকাতার প্রথম বারোয়ারি পূজা।  বর্তমানে যেটি শ্যামপুকুর আদি সার্বজনীন। মজার কথা, এটি ছিল  বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের পাড়ার পূজা।  

১৯২০-এর দশকে বারোয়ারি পূজা এক নতুন মাত্রা পায় এবং তা 'সর্বজনীন' রূপে আত্মপ্রকাশ করে। 'বারোয়ারি' শব্দটির মধ্যে যেখানে একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ভাব ছিল, 'সর্বজনীন' শব্দে তা মুছে গিয়ে তা হয়ে ওঠে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের উৎসব। কলকাতার দুর্গাপূজার ইতিহাসে ১৯২৬ সালটি একটি মাইলফলক। এই বছরই স্বামী বিবেকানন্দের ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত এবং বিপ্লবী অতীন্দ্রনাথ বসুর উদ্যোগে শিমলা ব্যায়াম সমিতিতে সর্বজনীন দুর্গাপূজার সূচনা হয়। প্রথম বছর পূজায় হোগলা পাতার প্যান্ডেল ও একচলার ক্যানভাসে ছিল মা দূর্গা।  এই পূজার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় শুরু হওয়া এই পূজা, তৎকালীন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল । ১৯৩৯-এ শুরু হয় পাঁচচালা ঠাকুরের পূজা, যার উদ্বোধন করেছিলেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, সেবছর তিনি-ই ছিলেন সভাপতি। গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনের সময়, দেবী প্রতিমাকে খাদির কাপড় পরিয়ে প্রতীকী আন্দোলন করা হয়। সম্ভবত এটিই ছিল শহরের প্রথম থিমের ঠাকুর, যার থিম ছিল জাতীয়তাবাদ। এই সর্বজনীন বিপ্লবী কার্যকলাপে নতুন করে হাওয়া দেয়। আর এই কারণেই তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার কয়েক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল এই পূজাকে। ১৯৩০ সালের পর থেকে বাগবাজারের সর্বজনীন দুর্গাপূজাও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মঞ্চ হয়ে ওঠে। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বরা এই পূজার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মণ্ডপের পাশাপাশি আয়োজিত হতো স্বদেশী মেলার, যেখানে ভারতীয় পণ্যের প্রচার করা হতো। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে প্রচারের অপরাধে এখন থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় চারণ কবি মুকুন্দদাসকে।  

বিংশ শতকের শেষের দিকে কলকাতার বারোয়ারি পূজা এক নতুন বাঁক নেয়। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু হয় 'থিম' পূজার জয়যাত্রা। সনাতনী একচালা প্রতিমা এবং কাগজের ফুল-শোলার সাজের সমান্তরালে মণ্ডপ ও প্রতিমায় ফুটে উঠতে থাকে সমকালীন সমাজ, শিল্পকলা, বিশ্ব ইতিহাস এবং লোকসংস্কৃতিতেও। কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীদের পাশাপাশি শান্তিনিকেতন ও সরকারি আর্ট কলেজের প্রথিতযশা শিল্পীরা মণ্ডপ সজ্জায় যুক্ত হতে শুরু করেন। আজ কলকাতার বারোয়ারি পূজা মানেই এক মাসব্যাপী উন্মুক্ত আর্ট গ্যালারি, যেখানে কয়েক কোটি মানুষের সমাগম ঘটে। এই দীর্ঘ দুই শতকের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের চূড়ান্ত স্বীকৃতি আসে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে। ইউনেস্কো (UNESCO) কলকাতার দুর্গাপূজাকে মানবজাতির 'ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ' (Intangible Cultural Heritage of Humanity) বা 'আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য'-এর মর্যাদা দেয়। বারো জনের হাত ধরে যে বারোয়ারির যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ বিশ্বমঞ্চে বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বজনীন উৎসব, যেখানে জড়িয়ে রয়েছে আরও কত অজানা ইতিহাস। 

0 0 0

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে সমর্থন করেন?

Note:"আপনার তথ্যের গোপনীয়তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী কথোপকথন এবং এখানে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ বা প্রকাশ করা হবে না"
×
  • CTVN