আধুনিক সভ্যতার সমস্ত সুযোগ-সুবিধা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর প্রযুক্তির দাপটকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, আফ্রিকার উত্তর তানজানিয়ায় আজও বেঁচে রয়েছে এক টুকরো আদিম পৃথিবী। লেক এয়্যাসির (Lake Eyasi) শুষ্ক উপত্যকায় বসবাসকারী 'হাজদা' (Hadza) উপজাতি, পৃথিবীর শেষ খাঁটি শিকারী-সংগ্রাহক (Hunter-Gatherer) গোষ্ঠী। আজ থেকে প্রায় দশ হাজার বছর আগে মানুষ যেভাবে বেঁচে থাকত, এই উপজাতির মানুষেরা আজও হুবহু সেই জীবনযাত্রাই বজায় রেখেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, মানব সভ্যতার আদিমতম জিনগত ইতিহাসের শেষ জীবন্ত লিঙ্ক বা যোগসূত্র হলেন এই হাজদা মানুষরা।
হাজদা উপজাতির পুরো জীবনটাই আবর্তিত হয় তাদের অনন্য এবং সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাদ্যাভ্যাসকে কেন্দ্র করে । এদের প্রধান ও একমাত্র জীবিকা শিকার, এছাড়াও বনের শস্য, ফল, কন্দ খেয়ে হাজদা-রা জীবনধারণ করে । প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে, হাজদা পুরুষরা দল বেঁধে শিকারের খোঁজে বের হয় । তাদের প্রধান হাতিয়ার বিষাক্ত তির এবং কাঠের ধনুক, যা দিয়ে তারা হরিণ, বুনো শুয়োর, বড় পাখি, বেবুন, জেব্রা, এবং প্রাইমেট বা বানর জাতীয় প্রাণী শিকার করে। এছাড়াও শামুক, ছোট বড় পোকা ,এমনকি বিষাক্ত সাপকেও শিকার করতে দেখা যায়। এরা বিষাক্ত ব্ল্যাক মাম্বা শিকার করে, তার চামড়া দিয়ে তীরধনুকে সাজিয়ে রাখে। কখনো কখনো এরা মাথা বাদ দিয়ে এই বিষাক্ত সাপের মাংস-ও খায়। হাজদা মহিলারা দল বেঁধে জঙ্গলে ঘুরে বেরায়, বুনো ফলমূল, মাটির নিচের কন্দ (Tubers) এবং ঔষধি গাছড়া সংগ্রহের জন্য। হাজদাদের প্রিয় খাবার হলো, খাঁটি বুনো মধু এবং বাওবাব (Baobab) গাছের ফল। বাওবাব ফলের ভেতরের সাদা অংশটিকে জলের সাথে মিশিয়ে তারা এক ধরণের পুষ্টিকর পানীয় তৈরি করে, যা ভিটামিন-সি-তে ভরপুর। শিকার করা পশুর কোনো অংশই তারা নষ্ট করে না; চামড়া থেকে শুরু করে হাড়ের ভেতরের মজ্জা—সবটাই আগুনে পুড়িয়ে অত্যন্ত তৃপ্তি সহকারে খায় তাঁরা। তেল, মশলা বা লবণের কোনো ব্যবহার এদের রান্নায় থাকে না, সম্পূর্ণ খাবারটিই সরাসরি কাঠের আগুনে ঝলসে নেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে পুষ্টিবিদ এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের গবেষণার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে হাজদা উপজাতির পাকস্থলী ও অন্ত্রের গঠন ও চরিত্র । গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক শহরের মানুষের তুলনায় হাজদাদের পেটে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি বৈচিত্র্যময় এবং উপকারী ব্যাকটিরিয়া (Gut Microbiome) রয়েছে । এদের খাদ্যাভ্যাসে কোনো প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনি বা রাসায়নিক প্রিজারভেটিভ থাকে না। আঁশযুক্ত বাওবাব ফল এবং বুনো কন্দ খাওয়ার ফলে এদের পরিপাকতন্ত্র অত্যন্ত শক্তিশালী। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, আধুনিক বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ—হৃদরোগ, ওবেসিটি (স্থূলতা), ডায়াবেটিস, ক্যানসার বা কোলন ইনফেকশনের মতো রোগ, যা হাজদা সমাজে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত । মরশুম পরিবর্তনের সাথে সাথে যখন এদের খাদ্যাভ্যাস বদলে যায় (যেমন বর্ষায় শুধু মধু আর ফল, শুষ্ক মরশুমে শুধু মাংস), তখন এদের পেটের ব্যাকটিরিয়াও নিজে থেকে সেই খাবার হজম করার জন্য পরিবর্তিত হয়ে যায়। এই কারণেই চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা মানুষের অন্ত্রের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের উপায় খুঁজতে হাজদাদের ওপর প্রতিনিয়ত গবেষণা চালাচ্ছেন।
নেট ব্যাঙ্কিং আর ফোন-পে-র যুগে, হাজদা উপজাতির অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো শুনলে অবাস্তব মনে হতে পারে। এদের সমাজে টাকা-পয়সার কোনো চল নেই। কোনো একটি জিনিস দিয়ে আরেকটি জিনিস নেওয়ার 'বার্টার সিস্টেম' বা বিনিময় প্রথার মাধ্যমেই এরা বহিরাগতদের সাথে সামান্য যোগাযোগ রাখে। মুদ্রার পরিবর্তে এরা মৌমাছির চাকের ভাঙা অংশ ব্যবহার করে l বদলে এরা, ধাতব সরঞ্জাম, কাচ, টায়ার, ভুট্টার গুঁড়ো সংগ্রহ করে l এই উপজাতির মধ্যে হিসাব রাখার চল নেই, সংখ্যা বলতে হাজদা-রা, ১ আর ২ বোঝে l ঘড়ি, ক্যালেন্ডার না থাকার কারণে এদের বয়স বা দিনের হিসেব রাখার ব্যবস্থা নেই l বর্তমানে কয়েকজন তানজানিয়ার সরকারি ভাষা শিখলেও, বেশিরভাগ হাজদা-রা পুরানো জীবন ধারণ করে l সবচেয়ে বড় কথা, এদের সংস্কৃতিতে 'ব্যক্তিগত সম্পত্তি' বা জমানোর কোনো ধারণা নেই। আজ শিকার করে যা পাওয়া গেল, তা আজই পুরো দলের সবার মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে খাওয়া হবে—আগামীকালের জন্য কোনো খাবার জমিয়ে রাখার নিয়ম এদের নেই । তাদের সমাজে কোনো রাজা, প্রধান থাকে না। সবাই সমান এবং যেকোনো সিদ্ধান্ত পুরো দল মিলে আলোচনা করে নেওয়া হয় । নারীরা অত্যন্ত স্বাধীন এবং শিকার বা ফলমূল সংগ্রহের ক্ষেত্রে পুরুষদের সমান গুরুত্ব পান। এদের নিজস্ব কোনো লিখিত লিপি বা ভাষা নেই, এক ধরণের অদ্ভুত 'ক্লিক সাউন্ড' (Click Language) বা জিভ দিয়ে আওয়াজ করে এরা নিজেদের মধ্যে মনের ভাব প্রকাশ করে ।
বর্তমানে প্রকৃতিপ্রেমী ও বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হলো এই অনন্য উপজাতির বিলুপ্তি । জলবায়ু পরিবর্তন, তানজানিয়ার পর্যটন শিল্পের বিস্তার এবং আশেপাশের পশুপালক ও কৃষক গোষ্ঠীর ক্রমাগত জমি দখলের কারণে হাজদাদের চারণভূমি দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। বন্য পশুপাখির সংখ্যা কমে যাওয়ায় তাদের শিকারের পরিধিও সীমিত হয়ে পড়ছে। বর্তমানে পৃথিবীতে মাত্র ১,০০০ থেকে ১,৩০০ জন হাজদা মানুষ বেঁচে আছেন, যার মধ্যে মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ জন সম্পূর্ণ আদিম নিয়মে শিকার করে জীবনধারণ করছেন। আধুনিক সভ্যতার গ্রাসে এই শেষ আদিম জনগোষ্ঠী চিরতরে হারিয়ে গেলে, প্রকৃতির সাথে মানুষের সহাবস্থানের সবচেয়ে প্রাচীন অধ্যায়টি সারা জীবনের জন্য মুছে যাবে।