বিশ্বের এক ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক শাড়ি হল বালুচরী শাড়ি। এই শাড়ির মধ্যেই লুকিয়ে আছে হাজারো গল্প। সুতোর প্রতিটা বুনোন যেন কথা বলে। এই শাড়িতে দেখা যায়, মহাভারতের ইতিহাস, টেরাকোটা শিল্প, আবার আদিবাসীদের নৃত্য, কোথাও হয়তো মসজিদ ও মন্দিরের সুন্দর কারুকার্য সুসজ্জিত থাকে। এই শাড়ির উৎপত্তি মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে, কিন্তু কিভাবে উৎপত্তি হল এই অসাধারণ শাড়ির? চলুন বালুচরীর অজানা ইতিহাসটা জানা যাক...
শোনা যায়, বালুচরীর উৎপত্তি অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে। তবে, এই শাড়ির জন্ম নিয়ে নানান মতবিরোধ আছে। একটি মতানুসারে, অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে, মুর্শিদাবাদের আজিমগঞ্জ-জিয়াগঞ্জ অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল বাণিজ্য কেন্দ্র। বহু দূরদূরান্ত থেকে বিভিন্ন রাজ্যের মানুষ এখানে ব্যবসা করতে আসতেন। তখনই কিছু গুজরাতী তাঁতীরা ভাগীরথীর পূর্ব পাড়ে এসে, কাপড় বুনতে শুরু করেন। সেই সময়ে ওই স্থানের নাম ছিল বালুচর,আর বালুচরেই গড়ে উঠেছিল শাড়ির শিল্প। বালুচর নামক স্থানে এই শাড়ির উৎপত্তি হয়েছিল, তাই এই শাড়ির নাম বালুচরী। অন্য একটি মতে, বাংলার নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ ১৭০৮ সালে সুবে বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মকসুদাবাদে স্থানান্তরিত করার পর, তাঁর বেগমদের জন্য নতুন শাড়ি তৈরির করার আদেশ দেন বালুচরের তাঁতীদের। তাঁতীরা নবাবের বেগমদের জন্য যে শাড়ি তৈরি করেন, সেই শাড়ির নামই বালুচরী নামে পরিচিত হয়।
নবাব মুর্শিদ কুলি খানের হাত ধরেই এই শিল্পের রমরমা বাড়তে থাকে। কিন্তু, কিছু বছর পর, বন্যা দেখা দিলে বালুচর গ্রামের প্রচুর ক্ষতি হয়, তাঁতিরা তখন আশ্রয় নেন বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর অঞ্চলে। সেখানে মল্ল রাজার হাত ধরে আবার এই শিল্প নতুন করে তৈরি হতে শুরু করে। বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা শিল্পের আদলে, এই শাড়ির ডিজাইন করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন পৌরাণিক গল্প ও প্রাচীনকালের জীবন যাত্রার চিত্রও ফুটে ওঠে এই শিল্পে। পরে, বিট্রিশ আমলে আবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই শিল্পের। কিন্তু ১৯৫৬ সালে চিত্রশিল্পী সুভো ঠাকুর এবং সুভেগেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে, বিখ্যাত কারিগর অক্ষয়কুমার দাস শাড়ির মধ্যে অজন্তা-ইলোরা মোটিফ লাগিয়ে নতুন বালুচরী নতুন ভাবে মানুষের কাছে নিয়ে আসেন। আর এই শিল্পের ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি হতে শুরু হয়।
এই শাড়ি মূলতঃ রেশম শাড়ি, কিন্তু এখন তাঁতের বালুচরী তৈরি করছেন শিল্পীরা। আর বাঁশ, কলা ইত্যাদি গাছের সুতো থেকে তৈরি হয় এই শাড়ি। এই শাড়ি বানাতে সময় লাগে এক সপ্তাহ। নানা উত্থানের পরও, সেই প্রাচীন সময় থেকে এই শাড়ি আজও বিশ্বে এক উজ্জ্বল স্থান অধিকার করে আছে। নারীরা, পুজো হোক বা বিয়েবাড়ি বা যেকোনো অনুষ্ঠানে একটা বালুচরী শাড়ি কিন্তু নিজেদের পছন্দের তালিকায় রাখেনই। আজও এই শাড়ির মধ্যে জীবিত রয়েছে বাংলার ঐতিহ্য আর শিল্প।