ভারতের একটি ঐতিহ্য হল লখনউের চিকন। মুঘল আমল থেকে আজও এর ঐতিহ্য একই ভাবে বজায় আছে। লখনউ থেকে সারা ভারত এবং ভারতের বাইরে কিভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠল লখনউ চিকন? কিভাবেই বা তৈরি হল এই চিকনকারী? চলুন জানা যাক...
খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে ভারতে চিকন কাজের অনুরূপ সূচিকর্মের উল্লেখ রয়েছে। মেগাস্থিনিস যিনি ভারতীয়দের সাহায্যে ফুলের মসলিন ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তবে, এই সূচিকর্মের নিদর্শন গুলিতে চিকনের বৈশিষ্ট্য যেমন রঙ, অলঙ্করণ বা কোনো উল্লেখযোগ্য অলঙ্করণের অভাব ছিল। বিখ্যাত ডিজাইনার লায়লা তৈয়বজির মতে, চিকনকারি মুঘল দরবারে পারস্যের সম্ভ্রান্তদের সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ভারতে এসেছিল । এমন একটি গল্পও রয়েছে, যাতে উল্লেখ করা হয়েছে, যে কিভাবে একজন ভ্রমণকারী একজন কৃষককে পান করার পানির বিনিময়ে চিকন নকশা শিখিয়েছিলেন। সবচেয়ে জনপ্রিয় মূল গল্পটি ভারতে চিকনকারী প্রবর্তনের জন্য মুঘল সম্রাজ্ঞী এবং জাহাঙ্গীরের স্ত্রী নূর জাহানকে কৃতিত্ব দেয়।
চিকন সূচিকর্মের কৌশলটি চিকনকারি নামে পরিচিত। চিকনকারি হল সুতি, চান্দেরি, মসলিন, জর্জেট, ভিসকস, সিল্ক, অর্গানজা, নেট ইত্যাদির মতো বিভিন্ন ধরনের টেক্সটাইল কাপড়ের উপর একটি সূক্ষ্ম এবং শৈল্পিকভাবে হাতের সূচিকর্ম। সাদা সুতো হালকা মসলিন এবং সুতির পোশাকের শীতল, প্যাস্টেল শেডের উপর এমব্রয়ডারি করা হয়। আজকাল চিকন এমব্রয়ডারি করা হয় রঙিন এবং সিল্কের সুতো দিয়ে। লখনউ এ আজ চিকনকারী শিল্পের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছে এবং লখনউ চিকন নামে পরিচিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে চিকনের কাজ মুকাইশ, কামদানি, বদলা, সিকুইন, পুঁতি এবং আয়নার কাজের মতো অতিরিক্ত অলঙ্করণ গ্রহণ করেছে, যা এটিকে একটি সমৃদ্ধ চেহারা দেয়। চিকন সূচিকর্ম বেশিরভাগ কাপড়ে করা হয় যেমন সুতি, আধা-জর্জেট, খাঁটি জর্জেট, ক্রেপ, শিফন, সিল্ক এবং অন্য যে কোনও কাপড় যা হালকা এবং যা সূচিকর্মকে হাইলাইট করে। ফ্যাব্রিক খুব ঘন বা খুব ফাঁকা হতে পারে না, তা না হলে এমব্রয়ডারির করা হয় না। এছাড়াও, ফ্যাব্রিকের বিপরীতে সেলাইয়ের অংশটিকে আলোর আভা দিয়ে ছায়া দিতে হয়, যাতে এই চিকনের নকশা ভালোভাবে ফুটে উঠে, যা এই ডিজাউনের মূল বৈশিষ্ট্য।
লখনউ চিকন এতটাই জনপ্রিয়, যে চিকনের ব্যবহার শুধু শাড়িতে নয়, বরং সালোয়ার সুট, কুর্তা, কুর্তি, পাঞ্জাবি, দুপাট্টা, ব্লাউজ ইত্যাদি বিভিন্ন পোশাকেও করা হয়। ঐতিহাসিক এই চিকনকারির রমরমা দিন দিন বেড়েই চলেছে। পাকিস্তানেও এই চিকনকারি বেশ জনপ্রিয়। ঈদ, দুর্গাপুজো, কালীপুজো বা যেকোনো অনুষ্ঠানে চিকনের পোশাকের ব্যবহার দেখা যায়। এমনকি লখনউতে রীতি আছে, বিয়েতে নববধূকে চিকন শাড়ি পরেই বিয়ে করতে হয়, এটা শুভ বলে মনে করা হয়। আভিজাত্য ও ফ্যাশনের মেল বন্ধন বজায় এখনও রেখেছে এই লখনউ চিকন।