জামদানি শুধু একটি শিল্প নয়, তাঁতের উপর ফুটে ওঠা এক অনন্য শিল্পভাষা। বাংলাদেশে জামদানি শিল্পের বেড়ে ওঠার গল্প আগে অনেক তো শুনেছেন। আজকের গল্পটা একটু আলাদা। আজকের আলোচ্য বিষয়টি হলো পশ্চিমবঙ্গে এই বিখ্যাত শিল্পের বেড়ে ওঠা ও টিকে থাকার লড়াই। তবে পশ্চিমবঙ্গের এই গল্পে যাওয়ার আগে জামদানি-র ইতিহাস তা একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক।
জামদানি শাড়ির আদি নিবাস ঢাকা, এবং মোগল আমল থেকেই এর সূক্ষ্ম ও নান্দনিক বুননের খ্যাতি বিশ্বজুড়ে। মোগল আমলে জন্ম এই শাড়ি এর গঠন হাওয়ার মতো ফুরফুরে এবং জলের মতো স্বচ্ছ। জামদানি শাড়ির খাঁটি হ্যান্ডলুম এবং এর বুননে তাঁতের টানাপড়েনে সত্যিই মুনশিয়ানা লাগে। এই শাড়ির আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে তার বুনন কৌশলে। জামদানি সম্পূর্ণ হ্যান্ডলুমে তৈরী করা হয়। তাঁতে বসেই মূল বুননের সঙ্গে তৃতীয় একটি সুতো ব্যবহার করে ফুটিয়ে তোলা হয় না না ধরণের ফ্লোরাল এবং জ্যামিতিক নকশা। আশ্চর্য্য রকমের সুন্দর এই বুনন পদ্ধতিতে দক্ষতা এবং সময়, দুই-ই অত্যাবশ্যক।
দেশভাগের পর বহু ছিন্নমূল হিন্দু তাঁতি এই বাংলায় এসে নতুন ঠিকানা খুঁজে নেন। সঙ্গে নিয়ে আসেন তাঁদের প্রজন্মের পর প্রজন্মের বুনন ঐতিহ্য। সেই হাতের কাজ ও আমাদের স্থানীয় তাঁতশিল্পের মেলবন্ধনেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে পশ্চিমবাংলার নিজস্ব জামদানি। নদীয়া, শান্তিপুর, ফুলিয়া, ধাত্রীগ্রাম থেকে পূর্ব বর্ধমানের সমুদ্রগড় ও কাটোয়া একাধিক অঞ্চল হয়ে ওঠে এই বুননের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। টাঙ্গাইলের বুননশৈলী ও জামদানির নকশার মেলবন্ধনে তৈরি হয় ‘টাঙ্গাইল জামদানি’। বর্তমানে সময় বদলেছে, শাড়ির গণ্ডি পেরিয়ে জামদানি সেজে উঠেছে বহুরূপে। দোপাট্টা ও ড্রেস মেটিরিয়াল সবকিছুতেই এখন জামদানি-র ছোঁয়া থাকছে ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখে।
তবে এখন পাওয়ার লুমের দৌরাত্ম্যে হ্যান্ডলুম জামদানি চিনবেন কী ভাবে ?
আসল জামদানি শাড়ির কোমরে গোঁজা অংশে সাধারণত পাড় থাকে না। আর মেশিনে তৈরি শাড়ির সর্বস্ব শাড়িজুড়েই পাড় দেখা যায়। হাতে বোনা জামদানি শাড়ির বুনোনেও দেখা যায় কিছু বিশেষত্ব । হ্যান্ডলুম শাড়ির বুনন সুক্ষ ও মসৃন হয় । অন্যদিকে পাওয়ার লুম জামদানি শাড়ি মেশিনে তৈরীর সময় নাইলনের সুতো ব্যবহারের কারণে তা তুলনামূলক ভারী ও খসখসে হয় । শাড়িটি উল্টো করে দেখলে বুঝতে পারবেন আসল জামদানিতে নকশার সুতো আলাদা করে কাটা বা ঝুলে থাকবেনা। কারণ তাঁতিরা হাতে হাতে সুতো ঘুরিয়ে নকশা বোনেন, তাই সোজা ও উল্টো পিঠের পার্থক্যও খুব বেশি বোঝা যায় না। আসল জামদানির সূক্ষ্মতাই শিল্পীর হাতের বুননের অন্যতম পরিচয়। তাই জামদানি কেনার সময় শুধু নকশায় মুগ্ধ হবেন না, বুননের সূক্ষ্মতাও চিনে নিন। কারণ প্রতিটি আসল জামদানির নেপথ্যে থাকে একজন তাঁতির ধৈর্য, দক্ষতা আর দীর্ঘ পরিশ্রম থাকে।