জাস্ট একবার ভাবুন, একটি আস্ত প্লেন মাঝ আকাশ থেকে হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেল। তার রইলো না কোনও খোঁজ, যাত্রী সহ একটা গোটা প্লেন হারিয়ে গেল সময়ের গহ্বরে। নিছকই দুর্ঘটনা? নাকি কোনও অলৌকিকতা? আর এরকমই রহস্যে মোড়া প্লেন নিখোঁজের ঘটনা ঘটে ৮ই মার্চ, ২০১৪ সালে। মালেশিয়ার কুয়ালালামপুর বিমানবন্দর থেকে, ২২৭ জন যাত্রী নিয়ে, ১২ টা বেজে ৪১ মিনিটে, Flight MH370 বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে উড়ে যায়। মালেশিয়া এয়ারলাইনসের জন্য এটাও আর পাঁচটা উড়ানের মতো স্বাভাবিক উড়ান ছিল। ওড়ার ঠিক ৩৯ মিনিট পর, রাত ১:১৯ মিনিটে মালয়েশিয়ার এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে ককপিট থেকে শেষ বার্তা পাঠান, "গুড নাইট, মালয়েশিয়ান থ্রি সেভেন জিরো"। এটুকু পর্যন্ত সব কিছুই স্বাভাবিক ছিল। ঠিক এর পরেই ঘটে গেল যে ঘটনা, তার সমাধান আজ অব্দি করা সম্ভব হয়নি।
রাত ১:২১ মিনিটে, বিমানের ট্রান্সপন্ডার হঠাৎ করেই সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এ টি সি-র রাডার থেকে বিমানটি নিখোঁজ হয়ে গেলেও, সামরিক রাডারে ধরা পড়ে যে বিমানটি তার নির্ধারিত রুট থেকে হঠাৎ তীক্ষ্ণ বাঁক নিয়ে উল্টো দিকে উড়তে শুরু করেছে। Flight MH370 মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের আকাশসীমার সীমানা ঘেঁষে এমন কৌশলে উড়ে যায়, যাতে কোনো দেশের সামরিক রাডারই এটিকে শত্রুভাবাপন্ন মনে করে সতর্কবার্তা জারি না করে। বিমানটির স্বয়ংক্রিয় ইঞ্জিন সিস্টেম ব্রিটিশ স্যাটেলাইট ইনমারস্যাট (Inmarsat)-এর সাথে প্রতি ঘণ্টায় একটি করে স্বয়ংক্রিয় সংকেত বা 'হ্যান্ডশেক' আদান-প্রদান করছিল। এই সংকেতের ডাটা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন যে, রাডার থেকে হারিয়ে যাওয়ার পরও বিমানটি আরও প্রায় ৭ ঘণ্টা আকাশে উড়ছিল। এই গতিপথ হিসাব করে দেখা যায়, বিমানটি দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের একটি নির্দিষ্ট বৃত্তাকার পথ বা 'সেভেন্থ আর্ক' (Seventh Arc)-এর দিকে এগিয়ে যাওয়ার পরে সম্ভবত জ্বালানি ফুরিয়ে যায় এবং তার পরে জন্ম হয় এই ফ্লাইট-এর অন্তর্ধান রহস্যের।
MH370-এর নিখোঁজ হওয়া নিয়ে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বহু বিশেষজ্ঞ বিভিন্ন তত্ত্ব দিয়েছেন, তার মধ্যে বিশেষ তিনটি তত্ত্ব নিয়ে সর্বাধিক আলোচনা হয়। প্রথমটি, পাইলটের আত্মঘাতী মিশন (Pilot Suicide): বিমানের সিনিয়র ক্যাপ্টেন জাহারি আহমেদ শাহ-কে নিয়ে। তদন্তে জানা যায়, নিখোঁজ হওয়ার এক মাস আগে তিনি নিজের ঘরের হোম ফ্লাইট স্টিমুলেটরে ভারত মহাসাগরের ওপর একটি কাল্পনিক রুট প্র্যাকটিস করেছিলেন, যা নিখোঁজ বিমানের সম্ভাব্য গতিপথের সাথে মিলে যায়। ধারণা করা হয়, তিনি ফার্স্ট অফিসারকে ককপিটের বাইরে পাঠিয়ে কৃত্রিমভাবে কেবিনের অক্সিজেন প্রেশার কমিয়ে সবাইকে অচেতন করে দেন এবং নিজেই বিমানটি নিয়ে সাগরের বুকে নেমে যান। দ্বিতীয় যে তত্ত্বটি উঠে আসে, হাইজ্যাকিং বা ছিনতাই: অন্য একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, বিমানে থাকা কোনো তৃতীয় পক্ষ বা হ্যাকার অত্যন্ত দক্ষভাবে বিমানের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অটো-পাইলট নিয়ন্ত্রণ করে এটিকে কোনো অজানা স্থানে নিয়ে যায়। তবে আজ অব্দি কোনো জঙ্গি গোষ্ঠী এর দায় স্বীকার করেনি। আর সর্বাধিক আলোচিত তত্ত্বটি হল, যান্ত্রিক ত্রুটি বা অগ্নিকাণ্ড: কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, বিমানে হঠাৎ ভয়াবহ আগুন লাগার কারণে বা হাইপোক্সিয়া (অক্সিজেন কমে যাওয়া)-র কারণে পাইলটরা অচেতন হয়ে পড়েন এবং বিমানটি 'ঘোস্ট ফ্লাইট' বা ভুতুড়ে প্লেন হিসেবে অটো-পাইলটে চলতে চলতে সাগরে আছড়ে পড়ে।
২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, চীন ও মালয়েশিয়া মিলে ভারত মহাসাগরের প্রায় ১,২০,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অনুসন্ধান চালায়, কিন্তু তাতেও কোনও লাভ হয়নি। তবে ২০১৫ সালের পর থেকে মাদাগাস্কার, রিইউনিয়ন দ্বীপ এবং আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের সৈকতগুলোতে বিমানটির ডানার অংশ (Flaperon)-সহ প্রায় ২৭টি ছোট-বড় টুকরো ভেসে আসে, যার মধ্যে ৩টি অংশ নিশ্চিতভাবে MH370-এর বলে দাবি করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞ মহলে প্রশ্ন ওঠে এই অনুসন্ধানের ফলাফল নিয়ে। ২০২৬ সালে আমেরিকার আধুনিক সমুদ্র অনুসন্ধানকারী সংস্থা ওশেন ইনফিনিটি (Ocean Infinity) মালয়েশিয়া সরকারের সাথে 'নো ফাইন্ড, নো ফি' (খুঁজে না পেলে টাকা দিতে হবে না) চুক্তিতে নতুন করে তল্লাশি শুরু করেছে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকা এই বিমানের রহস্যের জট কবে খুলবে বা আদৌ কোনোদিন জানা যাবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে ২৩৯ জন আরোহীর পরিবারের কাছে MH370 আজও এক অন্তহীন অপেক্ষা।