'শিল কাটাও'-বছর তিরিশ আগেও কলকতার অলি গলিতে শোনা যেত এই আওয়াজ। ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে ঠুকে ঠুকে খড়খড়ে করে দেওয়া হত শিল-নোড়া। আর তাতে বাটা হত মশলা। যুগ বদলেছে, মিক্সি সহ আরও আধুনিক গ্যাজেট জায়গা করে নিল বাঙালির রান্নাঘর। মানুষ হল আরও অলস, শিল নোড়া জায়গা করে নিল খাটের তলার একটা কোণে। যান্ত্রিকতার তীব্র গতি আর প্রযুক্তির আগ্রাসনে প্রতিদিন বদলে যাচ্ছে আমাদের চেনা চারপাশ। আজ যা অত্যাধুনিক, কাল তা-ই হয়ে পড়ছে অপ্রাসঙ্গিক। এই বিবর্তনের সবচেয়ে বড় কোপ এসে পড়েছে মানুষের রুজি-রোজগারে। একসময় যে পেশাগুলো ছাড়া সমাজ বা নাগরিক জীবন অচল ছিল, আজ তারা ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই খোঁজে। সত্তর-আশির দশকে থাকা অনেক পেশা-ই আজ কালের গর্ভে। এক প্রকার বাধ্য হয়ে তাদের যুক্ত হতে হয়েছে অন্য পেশায়।
ষাটের দশকের বাংলা, তখনও টিভির চল সেভাবে হয়নি। "কী চমৎকার দেখা গেল, বাগানের ভেতর বাঘ আইলো..." -একসময় এই চড়া সুরের হাঁক আর ডুগডুগির আওয়াজ শুনলেই পাড়ার ছেলেমেয়েরা ঘর ছেড়ে রাস্তায় ছুটে আসত। কাঠের তৈরি একটি রঙিন বাক্সের গায়ে কয়েকটি ছোট ছোট লেন্সে চোখ রাখলেই দেখা যেত মক্কা-মদিনা, তাজমহল কিংবা সিনেমার স্টিল ছবি, বায়োস্কোপ ওয়ালার রঙিন বাক্স। আজ ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্ম আর হাতের মুঠোয় থাকা ইউটিউবের যুগে বায়োস্কোপের রঙিন বাক্সে ধুলো জমেছে। এই পেশার শেষ প্রতিনিধিরা এখন আর গ্রামে বা শহরে ঘুরে ঘুরে পেট চালাতে পারেন না। অনেকেই বাধ্য হয়ে দিনমজুরি, সবজি বিক্রি বা রিকশা চালানো শুরু করেছেন। কেবল বিভিন্ন মেলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ডাক পেলে শখের বশে বা স্রেফ স্মৃতিকাতরতা থেকে তাঁরা বাক্সের ধুলো ঝেড়ে হাজির হন।
কয়েক দশক আগেও বাঙালি অফিসপাড়ার অঙ্গ ছিল টাইপরাইটার। টাইপিস্টের জীবন ঢুকে পড়েছিল ফুটপাত, পাড়ার রোয়াক থেকে বইয়ের পাতা, সেলুলয়েডেও। কয়েক দশক আগেও বাঙালি অফিসপাড়ার অঙ্গ ছিল টাইপরাইটার। কোর্ট থেকে সরকারি আপিস, খটা খট শব্দ তুলত টাইপরাইটার মেশিন। একটা সময় ছিল মাধ্যমিক পাশ করলেই বাড়ির ছেলেদের পাঠিয়ে দেওয়া হত শর্ট হ্যান্ড শেখাতে। শিখতে পারলেই চাকরি পাকা। যুগ পাল্টালো, কম্পিউটার দখল করল টাইপের জায়গা। একটু একটু করে পেশাহীন হয়ে গেল বহু মানুষ। অর্থসঙ্কটের মুখে এসে দাঁড়ালেন অনেক পরিবার। অনেকেই পেশা পরিবর্তন করলেও ,টেকনোলজির সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে অনেকই হয়ে রইলেন বেকার।
শীতের শুরুতে শহরের গলিতে গলিতে চড়া সুরে ডাক শোনা যেত- "ছুরি-কাঁচি ধার দেবে গো..."। কাঁধে একটা ভারী কাঠের চাকা নিয়ে ঘুরতেন তাঁরা। পায়ে প্যাডেল করে সেই চাকা ঘুরিয়ে লোহা বা ইস্পাতের ছুরিতে যখন শান দেওয়া হতো, তখন আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছিটকে বের হতো। ছোটদের কাছে তা ছিল এক চরম বিস্ময়। কিন্তু বর্তমান বাজারে সস্তা, রেডিমেড এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য ছুরি-কাঁচির আধিপত্য বেড়ে যাওয়ায় এদের প্রয়োজন আজ ফুরিয়েছে। এছাড়া আধুনিক রান্নাঘরে, ছুরি ভোঁতা হলে নতুন কেনাই পছন্দ করেন। এই পেশার মানুষেরা এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে। সারা শহর মাইলের পর মাইল হেঁটেও এখন আর দু-তিনটির বেশি বাড়ি থেকে ডাক আসে না। সামান্য যা আয় হয়, তা দিয়ে চাল-ডাল কেনাই দায়। এদের পরবর্তী প্রজন্ম পুরোপুরি অন্য পেশায় চলে গেছে।
এই বিলুপ্তপ্রায় পেশাগুলো কেবল একেকটি জীবিকা ছিল না, এগুলো ছিল আমাদের সংস্কৃতির অংশ। প্রযুক্তির উন্নয়নকে স্বাগত জানাতেই হবে, তবে এই পরিবর্তনের জোয়ারে যাঁরা পিষে যাচ্ছেন, তাঁদের পুনর্বাসন বা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। ঐতিহ্য রক্ষার্থে এই মানুষগুলোর শেষ জীবনটা যেন অন্তত সম্মানের সাথে কাটে, সেই উদ্যোগ নেওয়া আজ অত্যন্ত জরুরি।