Calcutta Television Network

পাহাড়ের কোলে কুয়াশামাখা আতঙ্ক: কার্শিয়াং-এর ডাওহিল ও ডেথ রোড-এর আসল রহস্য কী?

পাহাড়ের কোলে কুয়াশামাখা আতঙ্ক: কার্শিয়াং-এর ডাওহিল ও ডেথ রোড-এর আসল রহস্য কী?

21 August 2026 , 01:03:16 pm

পাইন ও ওক বনের ছায়ায় ঘেরা কার্শিয়াং-এর ডাওহিল অঞ্চলটি কেবল তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং এক অপার্থিব ও রহস্যময় আতঙ্কের জন্য ভারতের মানচিত্রে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,৮৬৪ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই ছোট্ট পাহাড়ি জনপদটিতে বছরের বেশিরভাগ সময়ই কুয়াশার রাজত্ব থাকে। যখন ঘন সাদা কুয়াশা ডেথ রোড বা ডাউহিলের গভীর অরণ্যকে গ্রাস করে, তখন চারপাশের চেনা পৃথিবীটা আচমকা যেন এক অন্য অচেনা, রহস্যময় জগতে ফিরে যায়। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস এবং যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা নানা হাড়হিম করা অভিজ্ঞতা এই কুয়াশামাখা পাহাড়কে এক অচেনা রহস্যে পরিণত করেছে।

দার্জিলিং জেলার কার্শিয়াং শহরের একটি বিখ্যাত পাহাড়ি এলাকা ডাওহিল। এই অঞ্চলের ফরেস্ট অফিস থেকে শুরু করে ভিক্টোরিয়া বয়েজ স্কুল পর্যন্ত বিস্তৃত রাস্তাটি স্থানীয়ভাবে 'ডেথ রোড' বা মৃত্যুসরণি নামে পরিচিত। এই নির্জন রাস্তায় একা হাঁটার সময় এক অদ্ভুত এবং ভারী অনুভূতির সম্মুখীন হতে হয় বলে অনেকেই দাবি করেন। দিনের আলোতেও যখন কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতা কমে আসে, তখন মনে হয় গাছের আড়াল থেকে কেউ বা কারা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ নজরে পথচারীকে লক্ষ্য করছে। কোনো কোনো পর্যটক এবং স্থানীয় কাঠুরিয়া জানিয়েছেন, এই রাস্তায় চলার সময় আচমকা তাদের পিছু পিছু অদৃশ্য কারো হেঁটে আসার পায়ের শব্দ পাওয়া যায়, কিন্তু থমকে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকালেই কুয়াশার চাদর ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। এই অদ্ভুত এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপ এতটাই তীব্র হয় যে, অনেকেই এই রাস্তায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন বা তীব্র আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়েন।

ডাওহিলে-র সবচেয়ে ভয়ংকর এবং রোমাঞ্চকর গল্পটি জড়িয়ে রয়েছে এক মুণ্ডহীন কিশোরকে (Headless Boy) কেন্দ্র করে। বহু বছর ধরে স্থানীয় কাঠুরিয়ারা দাবি করে আসছেন যে, গভীর বনে কাঠ কাটার সময় তারা এক কিশোরের অবয়ব দেখতে পেয়েছেন, যার ঘাড়ের ওপর কোনো মাথা নেই। সেই অশরীরী মূর্তিটি কুয়াশার ভেতর থেকে আচমকা বেরিয়ে এসে ডেথ রোড ধরে কিছু দূর হেঁটে যায় এবং তারপর চোখের পলকে খাড়া পাহাড়ি ঢাল বেয়ে গভীর পাইন বনের অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। জনশ্রুতি আছে, এই মুণ্ডহীন কিশোরকে যে বা যারাই সরাসরি চোখের সামনে দেখেছেন, তারা পরবর্তীতে এক চরম মানসিক ট্রমার শিকার হয়েছেন এবং কেউ কেউ দীর্ঘকাল তীব্র জ্বরে বা আতঙ্কে ভুগে মারা গেছেন। এই ঘটনাটি স্রেফ চোখের ভুল নাকি পাহাড়ের বুকে কোনো অতৃপ্ত আত্মার বিচরণ, তা আজও এক অমীমাংসিত রহস্য। 

পাহাড়ি ঢালে দাঁড়িয়ে আছে ব্রিটিশ আমলে তৈরি দুটি বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—ডাওহিল গার্লস স্কুল এবং ভিক্টোরিয়া বয়েজ হাই স্কুল। শীতের মরশুমে যখন ঠান্ডার কারণে স্কুলগুলো দীর্ঘ কয়েক মাসের জন্য ছুটি থাকে এবং বোর্ডাররা পাহাড় ছেড়ে সমতলে নেমে যায়, তখন এই বিশাল প্রকোষ্ঠগুলোতে নেমে আসে এক ভৌতিক নিস্তব্ধতা। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এই দীর্ঘ ছুটির দিনগুলোতে মাঝরাতে বন্ধ স্কুলবাড়ির ভেতর থেকে পিয়ানোর বিষণ্ণ সুর ভেসে আসে। কখনো কখনো করিডোর জুড়ে ছোট ছোট বাচ্চাদের খিলখিলিয়ে হাসির শব্দ কিংবা ভারী বুট জুতো পরে কারো হেঁটে যাওয়ার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। স্কুলের পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা নৈশপ্রহরী যারা এই চত্বরে থাকেন, তাদের অনেকেই দাবি করেছেন যে বন্ধ জানলার কাচ ভেদ করে ভেতরের অন্ধকার ঘরে অচেনা অবয়ব নড়াচড়া করতে দেখা যায়। 

প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর বা অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তাদের মতে ডাওহিলের ভৌতিক পরিবেশের পেছনে কাজ করে সেখানকার ভৌগোলিক অবস্থান। পাহাড়ের একাকিত্ব, পাইন বনের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া তীব্র বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ এবং ঘন কুয়াশার কারণে তৈরি হওয়া চোখের বিভ্রান্তি অনেক সময় মানুষের মনে ভয়ের উদ্রেক করে। প্রাচীন ওক এবং পাইন গাছের ডালপালা কুয়াশার মধ্যে অবিকল মানুষের কঙ্কাল বা মূর্তির মতো দেখায়, যা দুর্বল মনের মানুষকে সহজেই আতঙ্কিত করে তোলে। বিজ্ঞান একে মনস্তাত্ত্বিক ভয় এবং প্রতিধ্বনির খেলা বলে ব্যাখ্যা করলেও, ডাউহিলের সেই কুয়াশামাখা রাস্তা আর থমথমে পাইন বনের গভীরে পা রাখলে যুক্তিবাদী মানুষের মনেও এক অজানা আশঙ্কার কাঁপন ধরে যায়।

0 0 0

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে সমর্থন করেন?

Note:"আপনার তথ্যের গোপনীয়তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী কথোপকথন এবং এখানে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ বা প্রকাশ করা হবে না"
×
  • CTVN