প্রশান্ত মহাসাগরে ভেসে থাকা একটি ছোট্ট দেশ। ২১ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে থাকা এই দেশটি ভ্যাটিকান সিটি এবং মোনাকোর পর বিশ্বের ৩য় ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র। এর জনসংখ্যাও বেশ সীমিত। মাত্র ১১ হাজার অধিবাসী নিয়ে ভেসে রয়েছে এই দ্বীপ রাষ্ট্রটি। মাত্র দুই দশকেই বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী রাষ্ট্র থেকে ভাড়াটে রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে নাউরু। যেই নাউরুকে একসময় প্রশান্ত মহাসাগরের কুয়েত বলা হতো, সেই নাউরু এখন অন্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সাহায্যের উপরে নির্ভরশীল। কিন্তু কীভাবে এল এই বিশাল অধঃপতন?
হাজার হাজার বছর ধরে বিভিন্ন জাতের সামুদ্রিক পাখির অভরায়ণ্য ছিলো প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে এই নাউরু অঞ্চলটি। তাদের ফেলে যাওয়া বর্জ্য কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে জমতে জমতে, তৈরী হয় উৎকৃষ্ট মানের ফসফেটের টিলা। পরবর্তীকালে এই ফসফেটের টিলা নাউরুর জন্য ‘স্বর্ণের খনি’ হয়ে ধরা দেয়। ফসফেট কৃষি কাজের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি উপাদান এবং নাউরুতে যে ফসফেট পাওয়া যেত, সেগুলো মানে ছিল সর্বোৎকৃষ্ট। কিন্তু দেশটির আবাদি জমি প্রায় শুন্যের কাছাকাছি। ১৯০৬ সালে জার্মনরা প্রথম নাউরুর এই ফসফেট খনির সন্ধান পায়। ‘প্যাসিফিক ফসফেট কোম্পানি’ এর নামে এখান থেকে তারা ফসফেট উত্তোলন শুরু করে। এ অবস্থা চলতে থাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানরা পরাজিত হলে ‘ব্রিটিশ ফসফেট কমিশন’ এর নামে নাউরু থেকে ফসফেট উত্তোলন চলতে থাকে। ৭০-এর দশকে নাউরু ছিল মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে, পৃথিবীর অন্যতম ধনী দেশ। ফসফেট উত্তলন করে, নাউরুর সরকারের হাতে আসতে থাকে বিপুল পরিমাণ অর্থ। ১৯৭৫ সালে নাউরুর সরকারি ব্যাংকে জমা হয় ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার! স্বাধীনতার পর এক যুগের অর্ধেক সময়ে কোনো রাষ্টের এত বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হওয়া বিরল। আর সে সময় নাউরুর জনসংখ্যা ছিলো ৭০০০ এর কাছাকাছি। সরকার নাগরিকদের বিনামূল্যে চিকিৎসা, শিক্ষা, বাড়ি এবং কোনো কর (Tax) না দেওয়ার সুবিধা দেয়। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের শেষে ফসফেট শেষ হয়ে আসতেই দেশটি চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে,সাথে ছিল বিশাল আর্থিক দুর্নীতি। বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র এবং ঋণে জর্জরিত একটি রাষ্ট্র।
আয়তনে দ্বীপটি ছোট হলেও, এখানকার বাসিন্দারা আড়েবহরে বেশ চওড়া। কারণ বিশ্বের সবচেয়ে স্থূল মানুষের বাস এই দ্বীপে। দ্বীপের অধিবাসীদের প্রত্যেকের গড় বিএমআই ৩৪-৩৫! বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) রিপোর্ট অনুযায়ী, নাউরুর প্রায় ৯৪% মানুষ অতিরিক্ত ওজনের শিকার এবং প্রায় ৭০% মানুষ ওবেসিটির স্তরে পড়েন। ফসফেট মাইনিংয়ের ফলে দেশটির নিজস্ব চাষযোগ্য জমি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তারা সম্পূর্ণভাবে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত প্রক্রিয়াজাত প্যাকেটজাত খাবার এবং ফাস্ট ফুডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা এই স্বাস্থ্য সংকটের মূল কারণ। মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ নাগরিকের রয়েছে টাইপ-২ ডায়াবেটিস। কিডনি বিকল এবং হৃদরোগ সেখানে খুবই স্বাভাবিক। সেই সাথে নাউরুর ৯০ শতাংশ নাগরিকই বেকার। এখানকার বাসিন্দাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার হল ভাজা-ভুজি এবং কোলা জাতীয় পানীয়। বেশির ভাগ অধিবাসী ইনস্ট্যান্ট নুডলস, সোডা জাতীয় পানীয় এবং টিনজাত খাবার খেতেই অভ্যস্ত।
অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার পর নাউরু আয়ের বিকল্প উৎস হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার সাথে একটি চুক্তি করে। অস্ট্রেলিয়ায় অবৈধভাবে ঢোকার চেষ্টা করা শরণার্থীদের নাউরুর একটি বিশেষ ক্যাম্পে (Nauru Regional Processing Centre) এনে রাখা হতো, যার বিনিময়ে অস্ট্রেলিয়া সরকার নাউরু ওখানকার অর্থনীতি সচল রাখার জন্য বিপুল অর্থ সাহায্য দেয়। একসময়ের বিশাল প্রতিপত্তির মালিক নাউরুর, বর্তমান করুণ দশা আমাদের শিক্ষা দেয়, রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বদা সঠিক হাতেথাকা দরকার এবং দুর্নীতির ফলাফল হতে পারে এরকম মারাত্মক ভয়াবহ।