রেজিনা বিবি, বাড়ি দক্ষিণ ২৪ পরগনায়, কাজের সন্ধানে শহর কলকাতায় আসা। কাজ জুটলেও মাথা গোজার জায়গা নেই। গড়িয়াহাটের ভিড়-ভাট্টা শেষ করে,ফুটপাথের এক কোণে ত্রিপল লাগিয়ে, ঠাঁই নিয়েছিল সে। সাথে ৫ বছরের বাচ্চা। যাওয়ার আর জায়গা নেই, এখানেই থাকছে প্রায় বছর দশেক। হাতি বাগানের শ্যাম পালিত, দু পুরুষের ছোট্ট দোকান ফুটপাথে। রুজি রোজগার বলতে এটাই, মেয়ে বড় হচ্ছে। প্রায়ই সরকার থেকে দোকান তুলে দেয়,সব ঠান্ডা হলে ফের আবার ফিরে আসে এখানেই, নাহলে ঘরে হাঁড়ি চড়বে কেমন করে? ছেলে তাড়িয়ে দিয়েছে অনেকদিন, রবীন্দ্রসদনের উলটো দিকের ফুটপাথে ঠাঁই হয়েছে বিমলা দেবীর। বছর ৭৫ এর বৃদ্ধ ভিক্ষা করেই দু-মুঠো জুটিয়ে নেয়। শুধু মাথা গুঁজে থাকে ফুটপাথের এক কোণে।
শহুরে ব্যস্ততার সবচেয়ে বেশি সাক্ষী যদি কেউ হয়ে থাকে, তবে সেটা ফুটপাথ। ধনী আর দরিদ্রের যে কতটা ফারাক এখানে দাঁড়ালেই অনায়াসে বোঝা যায়। উচ্চবিত্তের ব্র্যান্ডেড জুতোর ধুলো মাড়িয়ে ফুটপাথের কোণটায় গিয়ে একটুখানি খিদে মেটানোর আশায় বসে থাকে ছিন্নমূল কোনও শিশু। ফুটপাথ চুপ করে দেখে এই বৈপরীত্য, কিন্তু কিছু বলতে পারে না, ও বোধহয় আমাদের মতোই বোবা ! ফুটপাথ কিন্তু জানে, দিনে ৫০০ টাকা রোজে মোট বওয়া ওই কুলিটার কথা, দিন গড়িয়ে রাত হয়, ঘামের দাগ লেগে থাকে ফুটপাথেই। এক কোণে মাটির পুতুল নিয়ে বসা হকারটার সুখ, দুঃখ, কান্না, ফুটপাথ কিন্তু সব জানে, শুধু কিছু বলতে পারে না। ফুটপাথ কিন্তু সাক্ষী বিমলা দেবীর চোখের জলের, ছেড়া তোষকে শুয়ে যখন সে চোখের জল ফেলে, ফুটপাথ চাইলেও সেই জল মুছিয়ে দিতে পারে না।
বিখ্যাত সিনেমা 'জলি এল এল বি'- র একটি দৃশ্যে বলা হয়েছিল, 'ফুটপাথ সোনে কে লিয়ে নেহি হোতা হ্যায়।' ঠিকই তো, ফুটপাথ হাঁটার জন্য,আড্ডা মারার জন্য। শহুরে ব্যস্ততায় ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাঁধা পেতে কার ভালো লাগে। ট্যাক্স দিয়ে থাকা শহুরে নাগরিক কি এই পরিষেবা চেয়েছে? তাহলে প্রশ্ন আসে, 'ওরা' কোথায় যাবে? গরমের দুপুরে, বর্ষার বিকালে, শীতের কনকনে রাতে ওরা কোথায় মাথা গুজবে? একটু ভেবে দেখুন তো, এই ব্যর্থতা কি আমার, আপনার, আমাদের দেশের নয়? যে ফুটপাথে থাকা একটা শিশুর এক মুঠো অন্নের জোগাড় করে দিতে পারে না আমাদের রাষ্ট্র।
শহরের প্রাণ যদি চওড়া রাস্তা গুলো হয়ে থাকে, তাহলে ধমনী ফুটপাথ। রক্ত চলাচল বন্ধ হলে যেমন মানুষ মরে যায়, ঠিক তেমনই ফুটপাথ বন্ধ হয়ে গেলে একটা গোটা শহর মরে যাবে। ফুটপাথ আশ্রয়দাতা, রুটিরুজির সংস্থান, নাগরিক জীবনের গল্পকার। আমরা 'ওদের' দেখি, দামি গাড়ির কাঁচ তুলে দেই অনায়াসেই। কিন্তু শহরের স্পন্দন, ঘাম আর কান্নার রূপ রাখা থাকে ফুটপাথেই।