Calcutta Television Network

স্মৃতির দূরদর্শন:বোকা বাক্সের সেই সোনার দিন গুলি

স্মৃতির দূরদর্শন:বোকা বাক্সের সেই সোনার দিন গুলি

12 August 2026 , 04:20:54 pm

যে সময়টার কথা,তখন বাঙালি মধ্যবিত্তের ঘরে ড্রইংরুম শব্দটা ততটা জাঁকিয়ে বসেনি। তখন বসার ঘরে চলতো সকালের চা,জলখাবার বা সন্ধ্যের চপ মুড়ির আড্ডা। আড্ডার এক সঙ্গী হিসাবেই ঘরের এক কোণে থাকতো,কাঠের সাটার দেওয়া একটা চারকোণা বাক্স,টিভি। ১৯৭২ রের পরে দিল্লী হয়ে দূরদর্শনের প্রসার শুরু হয় মুম্বাই,শ্রীনগর,অমৃতসর,কলকাতা,মাদ্রাস এবং লখনৌ-তে। আর সেই থেকে 'বোকা বাক্স' আড্ডার চিরকালীন সঙ্গী হয়ে থেকে গেলো বসার ঘর থেকে ড্রইং রুম অব্দি । সত্তরের দশকের শুরুর দিকে রেডিও-কে পিছনে ফেলে জায়গা করে নিলো সাদা-কালো টিভি।সাথে থাকতো আলমুনিয়ামের এন্টেনা,যেটা লাগানো থাকতো ছাদের মাথায়। ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম সম্প্রচার শুরু হলেও, ৯ অগস্ট, ১৯৭৫ সালে শুরু হল কলকাতা টেলিভিশনের পথ চলা। তখন অনেকের বাড়িতেই টিভি আসতে শুরু করেছে। তখনকার দিনে যাঁদের বাড়িতে টিভি ছিল,তাঁরা পরিচিতদের টিভি দেখতে আপ্যায়ন করতেন,শনি-রবি বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচারের সময় বা সাদা কালো সিনেমা দেখার জন্য,যা এখনকার দিনে ভাবাই যায় না। চপ-মুড়ি আর চায়ের কাপে,টিভির ঝিরঝির শব্দের সাদা কালো অনুষ্ঠান গুলি আজও নস্টালজিয়া। 

সে সময় ছাদ থেকে আওয়াজ ভেসে আসতো,"আরেকটু বাঁদিকে ঘোরা.....হ্যাঁ,হ্যাঁ এবার ঠিক আছে"-ব্যস ম্যাজিক বাক্সের পর্দায় ফুটে উঠতো সেই চিরাচরিত লোগো আর কানে আসত পণ্ডিত রবিশঙ্করের সুরে তৈরি দূরদর্শনের সেই সিগনেচার টিউন। ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম সম্প্রচার শুরু হওয়ার পরে ১৯৬৫ সালে আকাশবাণীর একটি অংশ হিসেবে আরম্ভ হয় দূরদর্শনের নিয়মিত সম্প্রচার এবং ১৯৭২ সালে ভারতের টেলিভিশন পরিষেবা মুম্বই (তদানীন্তন "বম্বে") এবং অমৃতসর পর্যন্ত পরিবর্ধিত হয়। এরপর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত মোট সাতটি শহর দূরদর্শন পরিষেবার আওতাভুক্ত হয়। তারপর ১৯৭৬ সালে দূরদর্শনকে আকাশবাণী থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি স্বতন্ত্র এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ পরিষেবায় রূপান্তরিত করা হয়। ১৯৮২ সালে দূরদর্শন জাতীয়স্তরের টেলিভিশন চ্যানেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ওই বছর  ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণ প্রথমবার সরাসরি সম্প্রচারিত হয় দূরদর্শনের পর্দায়। এরপরে ১৯৮২ সালেই দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসও সরাসরি সম্প্রচার করে দূরদর্শন। 

নব্বইয়ের দশকের রবিবারের সকাল শুরু হতো রামায়ণ-মহাভারত দিয়ে। আট থেকে আশি মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে থাকতো টিভির সামনে। কৃষ্ণের বিশ্বরূপ দেখে টিভির সামনেই টুক করে প্রণাম করে নিতেন দাদু ঠাকুমারা।  বেলা বাড়তেই মোগলি আর শের খানের লড়াই দেখতে দেখতে,ছোটদের চোখে খেলা করতো বিস্ময়। এখনও সেই "জঙ্গল জঙ্গাল বাত চলি হ্যায়..."-মাথার এক কোণে গুনগুন করে ওঠে। এছাড়াও হম লোগ, বুনিয়াদ, এবং হাস্যরসাত্মক অনুষ্ঠান য়ে জো হ্যায় জ়িন্দেগি  জনপ্রিয়তার শীর্ষে আরোহণ করেছিল ও সেই সময়ের ভারতীয় দর্শকদের অমোঘ আকর্ষণে টেলিভিশনের পর্দার সামনে বেঁধে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। দূরদর্শন কিন্তু বিজ্ঞাপনেও বেশ নস্টালজিয়া তৈরী করে গেছে। অলআউট,হাজমোলা ,ওনিডা,অপ্সরা আর নটরাজ পেন্সিল,লাইফবয়,বুস্ট,পার্লে জি,ম্যাগি,বাজাজ,ওয়াসিং পাউডার নির্মা-র জিঙ্গেল গুলো আজও আমাদের কাছে নস্টালজিয়া। আর ছিল সেই কালজয়ী গান- "মিলে সুর মেরা তুমহারা"-বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সেই সুর যখন টিভির পর্দায় বিভিন্ন ভাষার শিল্পীদের কণ্ঠে বেজে উঠত,তখন অজান্তেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠত। ‘ব্যোমকেশ বক্সী’, ‘ফেলুদা’, ‘শ্রীমান শ্রীমতীর'-পীতাম্বর কিংবা ‘তেরাহ পানে’-র মতো ধারাবাহিকগুলো মানুষকে ভাবতে শেখাত। আর রবিবারের বিকেল চারটে মানেই ছিল অঘোষিত কার্ফু। হিন্দি সিনেমার সেই চেনা চারকোনা ফ্রেমের  দৃশ্য দেখার জন্য সপ্তাহের ছ-দিন অপেক্ষা করে থাকত সেই সময়কার মানুষ। সিনেমা শেষ হতে হতে যখন সন্ধে নেমে আসত, তখন মনখারাপের একটা চোরা স্রোত বইত,আহা, ছুটিটা বুঝি শেষ হয়ে গেল। 

আজ আমাদের মুঠোফোনে হাজারটা বিনোদনের হাতছানি। আমরা প্রত্যেকে নিজের নিজের স্ক্রিনে একা,বিচ্ছিন্ন। আজকাল রবিবারের বিকেল গুলো কাটে সোশ্যাল মিডিয়ার রিল বা ট্রোলের ভিড়ে। কিন্তু দূরদর্শন শুধু একটা চ্যানেল ছিল না, তা ছিল যৌথ পরিবারের ড্রয়িংরুমে সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে রাখার এক জাদুর আঠা। সেই সাদাকালো বা প্রথম দিককার রঙিন পর্দাটা আমাদের একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে শেখাত, একসঙ্গে হাসতে আর কাঁদতে শেখাত। প্রযুক্তির ঝকঝকে আলোয় দূরদর্শন আজ হয়তো এক কোণে পড়ে থাকা এক মলিন স্মৃতি,কিন্তু বাঙালি তথা ভারতবাসীর মননে তার স্থান চিরকাল সেই এন্টেনার মতোই উঁচুতে থাকবে।


0 0 0

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে সমর্থন করেন?

Note:"আপনার তথ্যের গোপনীয়তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী কথোপকথন এবং এখানে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ বা প্রকাশ করা হবে না"
×
  • CTVN