অনিন্দ্য বিশ্বাস: বছর ২৯-এর গৃহবধূ দেবশ্রী, বিয়ে হয়েছিল ২১ বছর বয়সে। এক ছেলে আর স্বামীকে নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে সুখের সংসার। টাকা পয়সার খুব একটা অভাব নেই, কিন্তু যে অভাবটা আছে তা হল, সুখের, শারীরিক সুখের। যদিও বা মাসে দু একদিন ওরা একে ওপরের কাছে আসে কিন্তু সেই তৃপ্তি পায়না ও। প্রতিবার যেন সুখের নাটক করে যেতে হয় দেবশ্রীকে। আর তাছাড়া ছেলে জন্মানোর পর থেকে স্বামীর সাথে শারীরিক দূরত্বটা ক্রমে আজ এক আলোকবর্ষ। প্রতিরাত কাটে ডুকরে কেঁদে। কখনও কখনও দেবশ্রীর মনেও হয়েছে এক এক সময়, যদি একজন সঙ্গী থাকত। কিন্তু কোথাও গিয়ে আটকে গেছে বারবার। এই গল্পটা শুধু দেবশ্রীর নয়, গল্পটা ভারতবর্ষের অধিকাংশ ঘরেই। একটি সমীক্ষা বলছে, ৭০ শতাংশ ভারতীয় নারী নিজের পুরুষ সঙ্গীকে খুশি করতে গিয়ে 'সিউডো অর্গাজম'-এর সাহায্য নেয়, যাকে সাধারণ ভাবে বলা যায়, পরিতৃপ্তির নাটক। শহরতলি বা গ্রামের মহিলাদের একাংশ আজও জানে না অর্গাজম কি, শুধু একটা পুরুষই নয়, নারীরও সুখের চাহিদা আছে, সেটা তাদের ধারণার বাইরে।
মজার ব্যাপার নারীর এই যৌনতৃপ্তি বিষয়টা শুধু তাদের কাছেই অজানা তা নয়, তার পুরুষ সঙ্গীটিও সেটা জানে না বা বোঝার ক্ষমতার বাইরে। বলা ভালো এই নিয়ে কখনও কেউ খোলাখুলি কথা বলতে আজও দ্বিধা বোধ করে। যে দেশ ওয়েবে নীল ছবি সার্চে তিন নম্বরে রয়েছে, সেই দেশের লোক 'সেক্স' শুনলে আজও ছুঁৎমার্গী হয়ে ওঠে। খাজুরাহো থেকে ইলোরা, বাৎসায়নের কামসূত্র, যৌনতা নিয়ে আমাদের দেশের সংস্কৃতি বহু বহু পুরানো, হাজার বছর আগেও যেখানে যৌনতা এক স্বাভাবিক কলা ছিল, আজ তা সমাজের চোখে খারাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে নবারুণ ভট্টাচার্যের একটা লাইন মনে পড়ে যায়, 'সবাই লাগায়, সবাই বাগায়, সকলেরই হবে অন্ত/আজ যে শিশু করছে হিসু কাল-কেলাবে দন্ত।' সবাই সব দেখে, সেই সুখও চায়, কিন্তু আলোচনা করতে গেলেই ওঠে গেল গেল রব।
আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে, যৌনতা এখনও পুরুষের একচেটিয়া আনন্দ, মেল্ ইগো আর শুধু মাত্র বংশ বিস্তারের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। যুগ যুগ ধরে যৌনতা থেকে গেছে এভাবেই, হ্যাঁ বর্তমান প্রজন্ম এই নিয়ে আওয়াজ তুললেও সেই সংখ্যাটা হাতে গোনা। আরও মজার ব্যাপার, যৌন মিলনে যে নারীর পরিতৃপ্তির সমান অধিকার আছে, তা অধিকাংশ পুরুষ আজও ভাবতে পারেনা। সেই সঙ্গে সঠিক যৌন শিক্ষার অভাব, পর্ণ ফিল্মে দেখানো কিছু অবাস্তব মিলন আরও বিষয়টিকে খারাপের পর্যায় নিয়ে গিয়েছে। 'পেনিট্রেটেড সেক্স'-ই নারীর পরিতৃপ্তির এক মাত্র উপায় এই ধারণা নিয়ে থেকে গেছে এ দেশের অধিকাংশ পুরুষ। বিষয়টা কিন্তু উল্টো, একটি সমীক্ষা বলছে মাত্র ২৫-৩০ শতাংশ নারী শুধুমাত্র মিলনের মাধ্যমে চরম পরিতৃপ্তি পান। বাকি ৭০ শতাংশ নারীর জন্য, দীর্ঘ ফোর-প্লে, জি-স্পটের উদ্দীপনা অনেক বেশি গুরুত্ব রাখে। তবে নারীর জি-স্পট আজও বহু পুরুষ সঠিক ভাবে খুঁজে পাননি, চেষ্টাও করেননি।
এবার আসা যাক 'সিউডো অর্গাজম'-র বিষয়ে। আগেই বলেছি, এ দেশের ৭০ শতাংশ নারী নিজের পুরুষ সঙ্গীকে খুশি করার জন্য এর সাহায্য নেয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় একজন পুরুষ তার নারী সঙ্গীর শরীরের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হন, সেক্ষেত্রে নারী সঙ্গীর শরীরও তখন খুব একটা সায় দেয়না, ফলে অনেক সময় যোনি গাত্রে সিক্রেশন কম হয়ে গেলে, ভয়ঙ্কর ব্যথার সম্মুখীন হতে হয় সেই মেয়েটিকে। এসবের থেকে রেহাই পেতে, এবং নিজের পুরুষ সঙ্গীটিকে খুশি করতে ছদ্ম পরিতৃপ্তির অভিনয় করে তখন। সঙ্গীকে খুশি রাখার বা তার 'মেল্ ইগো' যাতে আঘাত না পায়, সেকারণেও এই ছদ্ম পরিতৃপ্তির সাহায্য নেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, লোক লজ্জায় বা ভয়ে যৌন চাহিদার কথা মেয়েরা মুখেই আনতে পারেনা। এই সিউডো অর্গাজম সাময়িকভাবে পুরুষটির অহংকারকে তৃপ্ত করলেও, দীর্ঘমেয়াদে মেয়েটির মনে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা এবং সম্পর্কের প্রতি উদাসীনতা তৈরি করে।
সঠিক যৌন শিক্ষার অভাব আর পার্টনারের সাথে মিস কমিউনিকেশন আপাত দৃষ্টিতে এই সমস্যার মূল কারণ বলেই মনে হয়। এ দেশের পুরুষদের একাংশের কাছে মনে হয় যে উল্টো দিকের সঙ্গীর মতামত বা নিজের পারফর্মেন্স নিয়ে কথা বলা নিজের পুরুষত্বকে ছোট করা। নারী শরীর তাদের কাছে ভোগ্য বস্তু হলেও নারীদের মন, শরীরের গঠন, সেনসিটিভ অঙ্গ, আলতো চুমু, মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া বা ছোট্ট কোনো বিষয় নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ থাকে না। মেয়েদের অর্গাজম শুধু একটি শারীরিক প্রক্রিয়া নয়, তাতে আসে মন, পরিবেশ, পরিস্থিতি আরো অনেক কিছু, তা অর্ধেক ছেলেদের বোঝার বাইরে। তাই সবার আগে পুরুষ মানসিকতায় বদল আনতে হবে। বুঝতে হবে, যৌনতা কোনও এক তরফা পারফর্মেন্স বা যুদ্ধ জয়ের বিষয় নয়, যৌনতা দুটো শরীর ও মনের আদান প্রদান। ছেলেদের এটাও বুঝতে হবে, নারীর এই ছদ্ম পরিতৃপ্তি কোথাও না কোথাও গিয়ে তাদেরই ব্যর্থতা।
তাই একটা ডিনার ডেট, নিজেদের মধ্যে অনেকটা সময় কাটানো, গান শোনা, কখনও সখনও আলতো চুমু, আর ফোর-প্লে, লং টার্মে একটা সম্পর্ককে মারাত্মক ভাবে গ্লোইং রাখে। ভয় আর জড়তা ভুলে গিয়ে খোলাখুলি কথা বললে সম্পর্ক হবে আরও মজবুত। নতুন প্রজন্ম আজ অনেকটাই এগিয়ে গেছে এই বিষয়ে। সেক্সের ক্ষেত্রে তাদের ওরিয়েন্টেশন নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা সমাজকে একটি নতুন দিক দেখাচ্ছে অবশ্যই। আগামী দিনে আশা করা যায়, সমাজ যৌনতাকে নিয়ে নারী-পুরুষ উভয়কেই গুরুত্ব দেবে, যাতে আর কোনো দেবশ্রীকে রাতের পর রাত চোখের জল ফেলে কাটাতে না হয়।