অমিত আর রিয়ার চার বছরের সম্পর্ক ভেঙে গেল। একদিনে এই সিদ্ধান্ত নেয়নি রিয়া, সব বিষয়েই দায় এড়িয়ে যেত অমিত, ইমোশনালি-ও ওকে পাশে পেত না রিয়া। সব মিলিয়ে একটা ক্ষোভ, অভিমান আর দুঃখ সম্পর্কটাকে অনেক আগেই শেষ করে দিয়েছিল। প্রথম প্রথম ভয় লাগত, অমিতকে ছাড়া রিয়ার কি ভাবে চলবে, এই গোটা চার বছর ধরে ওর জীবনে শুধু অমিত-ই রয়েছে। অশান্তি-ঝগড়া, মান-অভিমান হলেও এইটুকু ও জানতো যে অমিত আছে। আজ ও একা, বাড়ির এই রাস্তাটায় চার বছরে অমিতের বাইকেই এসেছে। আজ ও নেই, রয়ে গেছে ওর দেওয়া ট্রমা, আঘাত আর কিছু খারাপ অভ্যেস। কিভাবে ও সবটা সামলে উঠবে, নতুন কেউ জীবনে এলে পারবে তাকে ভালোবাসতে?
একটা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া যে কেবল দুটো মানুষের আলাদা হয়ে যাওয়া তা নয়, এই আঘাতের ক্ষত হয়ে থাকে মনে অনেক গভীর ভাবে। কেউ সেটাকে কাটিয়ে উঠতে পারে, কেউ সেটা সাথে নিয়ে জীবন কাটায়। এই ক্ষত বাড়তে বাড়তে কখনও কখনও চরমে পৌঁছায় আর সেটাই দাঁড়ায় 'রিলেশনশিপ ট্রমা'-তে। অনেকেই ভাবেন আবার নতুন সম্পর্কে গেলে হয়ত এই কষ্টের লাঘব হবে। কিন্তু হয় ঠিক উল্টোটা, আগের সম্পর্কের ট্রমা প্রভাব ফেলে এই সম্পর্কেও। ফের নতুন করে দুটো মানুষের জীবনে নেমে আসে ঝড়। আসলে মানুষ অভ্যাসের দাস, আর সবচেয়ে বেশি যেটা মানুষ মনে রাখে সেটা হল আঘাত। হতেই পারে বর্তমানে যে মানুষটি আছে সে একদম ই আলাদা। কিন্তু আমাদের ব্রেন সেটাকে আলাদা করতে পারে না। এই তখনই আমরা চলে যাই ডিফেন্সিভ মোডে। পুরোনো সঙ্গীর করা প্রতারণা গুলি আমাদের মধ্যে তৈরী করে ট্রাস্ট ইস্যু। আর সেটার প্রভাব এসে পড়ে নতুন সম্পর্কে। নতুন জীবনসঙ্গীটির ফোন ব্যস্ত পেলে বা অকারণেই আমাদের মনে তৈরি হয় সন্দেহ। সামান্য মতবিরোধ আকার নেয় অনেক বড় ঝগড়ার। নতুন করে আঘাত পাওয়ার ভয়ে মন-ও আর সেভাবে আমাদের সায় দেয়না, ফলে নতুন সম্পর্কে থাকলেও একটা দূরত্ব হয়েই যায় সঙ্গীর সাথে। আর সবচেয়ে সমস্যার হয়ে দাঁড়ায়, যেকোনও বিষয়ে পুরোনো সঙ্গীর সাথে নতুন মানুষটিকে তুলনা করে ফেলি। মজার বিষয় এগুলো আমরা করতে না চাইলেও অবচেতনে কাজ গুলো হয়েই যায়। মনস্তাত্ত্বিকদের মতে, যখন কোনো সম্পর্কে আমরা চরম অবহেলা, মানসিক নির্যাতন (Gaslighting), বা প্রতারণার শিকার হই, তখন আমাদের মস্তিষ্ক সেই আঘাতকে একটি 'বিপদ' হিসেবে সিগন্যাল দেয়। নতুন সম্পর্কে যাওয়ার পরও মস্তিষ্ক, আমাদের মানসিক ভাবে সুরক্ষিত রাখতে গিয়ে সেই পুরোনো ভয়ের স্মৃতিগুলোকে বারবার সামনে নিয়ে আসে। আমরা ভুলে যাই যে পুরোনো মানুষটি আর নেই, সে বদলে গেছে, পরিস্থিতিও বদলে গেছে।
পুরোনো ট্রমা বয়ে বেড়ানো মানে নিজের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ দুটোকেই শাস্তি দেওয়া। এই মানসিক বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসার কিছু টিপস রইল: ১. আঘাতকে স্বীকার করে নেওয়া :নিজের ক্ষত কে মেনে নিন । আপনি যে মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা অস্বীকার না করে মন থেকে স্বীকার করুন। নিজেকে বোঝান, "আমার অতীত খারাপ ছিল, কিন্তু তার জন্য আমার বর্তমান দায়ী নয়।" ২. যোগাযোগ ও সততা: নতুন সঙ্গীর সাথে লুকোচুরি না করে খোলামেলা কথা বলুন। তাকে জানান যে আপনার অতীতে এমন কিছু ঘটেছে যে কারণে আপনার মধ্যে একটা ভয় কাজ করে। তবে খেয়াল রাখবেন, এটিকে যেন অজুহাত হিসেবে ব্যবহার না হয়। সঙ্গীকে বলুন, "আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে চাই, কিন্তু আমার একটু সময় লাগবে।" ৩.Therapy: ট্রমা যদি খুব গভীর হয়, তবে একজন অভিজ্ঞ থেরাপিস্ট বা কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। থেরাপি আপনাকে শেখাবে কীভাবে পুরোনো স্মৃতিকে বর্তমান জীবন থেকে আলাদা করতে হয়। ৪. ধৈর্য ধরা: মনের ক্ষত এক রাতে সারে না। নিজেকে সময় দিন। নতুন সম্পর্ককে তাড়াহুড়ো করে কোনো ছাঁচে ফেলার চেষ্টা করবেন না। এবং শেষ কথা, অতীতকে আমরা বদলাতে পারব না, কিন্তু অতীত যাতে আমাদের বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ না করে, সেই চাবিকাঠি আমাদের হাতেই রয়েছে। নতুন সম্পর্ক মানে একটি নতুন গল্প, সেখানে পুরোনো কালির দাগ টেনে লাভ নেই। পুরোনো ট্রমা ঝেড়ে ফেলে নতুন মানুষকে, নতুন জীবনকে খোলা মনে গ্রহণ করাই হোক সুস্থ মানসিকতার পরিচয়।