Calcutta Television Network

পোষ্যচরিত মানুষ

পোষ্যচরিত মানুষ
15 September 2026 05:39:56 pm

সেই আদিমকাল কিংবা তুষারযুগেও মানুষ পোষ্য রাখতো। তাই পোষ্য রাখা মানুষের কাছে নতুন কোনও বিষয় নয়। কুকুর, বিড়াল থেকে শুরু করে নানা ধরনের পাখি কিংবা অন্য প্রাণীকে পারিবারিক সদস্যের মতোই আগলে রাখেন মনুষ্যকুল। তাদের খাওয়ানো, ঠিকঠাকভাবে পরিচর্যা করা, খেলতে নিয়ে যাওয়া কিংবা আদর করা, সবই করেন আপনজনের স্নেহে। কিন্তু এই আচরণ যে শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তা কিন্তু একেবারেই নয়, নতুন তথ্য উঠে এসেছে এক গবেষণায়। বিজ্ঞানীদের দাবি, বানরজাতীয় প্রাণীদের মধ্যেও অন্য প্রজাতির জীবকে কাছে রেখে যত্ন নেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। মানুষের পোষ্যপ্রেমের শিকড়ও সম্ভবত সেই আদিম আচরণের মধ্যেই গোপনে রাখা রয়েছে।

উগান্ডার জঙ্গলে শিম্পাঞ্জিদের নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এমনই একটি অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী হন গবেষকেরা। ইশে ও ডেম্বে নামে দু’টি অল্পবয়সি শিম্পাঞ্জির গতিবিধি তাঁরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছিলেন। এক দিন ক্রীড়ারত  অবস্থায় তাদের কাছে চলে আসে একটি রেড-টেলড বানর। গবেষকেরা ভেবেছিলেন, শিম্পাঞ্জি দু’টি হয়তো তাকে তাড়া করবে বা পাল্টা আক্রমণ করবে। কিন্তু বাস্তবে তাঁরা সাক্ষী থাকেন সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনার। তারা ছোট প্রাণীটির প্রতি আক্রমণাত্মক না হয়ে তার সঙ্গে স্নেহপূর্ণ আচরণ শুরু করে। এমন আচরণ নিয়েই পরে আরও বিস্তারিত গবেষণা শুরু করেন বিজ্ঞানীরা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী সিরিল গ্রুয়েটার ও তাঁর সহকর্মীরা ৮৮টি বানরজাতীয় প্রাণীর আচরণ খতিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। জঙ্গল থেকে চিড়িয়াখানা, আলাদা আলাদা পরিবেশে থাকা প্রাণীদের মধ্যেই অন্য প্রজাতির জীবকে কাছে টেনে নেওয়ার প্রবণতা তাঁরা লক্ষ্য করেন। কোথাও বানরের খাঁচায় ঢুকে পড়া মুরগিকে দীর্ঘ সময় ধরে যত্ন করতে দেখা গিয়েছে। আবার কোথাও টিকটিকি, পাখি বা কাঠবিড়ালির মতো প্রাণীকেও নিজেদের কাছে রেখে দিয়েছে প্রাণীকুল। এমনকি ছোট প্রাণীদের সঙ্গে খেলতেও দেখা গিয়েছে কয়েকটি বানর প্রজাতিকে। বিশেষ করে স্ত্রী বানরদের মধ্যে এই ধরনের যত্নশীল আচরণ বেশি লক্ষণীয়। যদিও সব বানরের আচরণ এক রকম হয় না। কিছু পুরুষ বানরকে অন্য প্রজাতির প্রাণী দেখলে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতেও দেখা গেছে।

‘জার্নাল প্রাইমেটস’-এ প্রকাশিত গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, এই প্রবণতার পিছনে সঙ্গের প্রয়োজনীয়তা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অর্থাৎ নিঃসঙ্গতা দূর করা কিংবা সামাজিক সম্পর্ক তৈরির জন্যই হয়তো প্রাণী জগতে অন্য প্রাণীকে কাছে টেনে নেওয়ার বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। মানুষের পোষ্য রাখার কারণও বহু ক্ষেত্রে এক হয় না। কেউ বন্ধুত্বের জন্য প্রাণী পোষেন, কেউ নিরাপত্তার জন্য, আবার কারও কাছে পোষ্য সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। অতীতেও মানুষ শিকার কিংবা আত্মরক্ষার প্রয়োজনে প্রাণীকে সঙ্গে রাখত বলে মনে করছেন গবেষকরা। জার্মানিতে প্রায় ১৪ হাজার বছরের পুরনো একটি সমাধিতে মানুষ ও কুকুরের দেহাবশেষ একত্রে পাওয়ার ঘটনাও পোষ্যের সঙ্গে মানুষের দীর্ঘ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। তবে ঠিক কখন থেকে এই সম্পর্কের শুরু, তার নিশ্চিত প্রমাণ আজ অবধি মেলেনি। গবেষকদের ধারণা, অন্য প্রাণীর যত্ন নেওয়ার স্বভাব মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসে প্রাচীনতম অভ্যাসগুলির একটি।

×
  • CTVN