Calcutta Television Network

আয় ঘুম, যায় ঘুম

আয় ঘুম, যায় ঘুম
15 September 2026 05:36:47 pm

শক্তিশালী দাঁত নেই, নেই ধারালো নখ, এমনকি শরীরের জোরেও মানুষ অন্য অনেক প্রাণীর কাছে বেশ পিছিয়ে। তবু পৃথিবীর বিবর্তনের ইতিহাসে মানুষের মতো প্রভাবশালী প্রাণী বিরল। কী ভাবে এলো এই সাফল্য? কানাডার টরন্টো মিসিসগা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডেভিড স্যামসনের মতে, এর পেছনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে মানুষের ঘুমের ধরণ পরিবর্তনের। ‘স্লিপ অ্যান্ড হিউম্যান ইভলিউশন’-এর ডিরেক্টর স্যামসন দীর্ঘদিন ধরে মানুষ ও অন্যান্য প্রাইমেটের ঘুম নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করে চলেছেন। তাঁর পরীক্ষানিরীক্ষার অভিজ্ঞতা ও যাবতীয় গবেষণার উপর লেখা বই ‘দ্য স্লিপলেস এপ: দ্য স্টোরি অফ স্লিপ ইন হিউম্যান ইভলিউশন’। শিম্পাঞ্জি, বিভিন্ন প্রজাতির বানর এবং তানজ়ানিয়ার হাডজ়া জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন খুবই কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করে মানুষের ঘুমের সঙ্গে বিবর্তনের সম্পর্ক বোঝার প্রয়াস করেছেন।

গবেষকের মতে, মানুষের শরীরের তুলনায় মস্তিস্কের আয়তন বড়। পাশাপাশি দলবদ্ধ থাকা এবং একে অপরকে সাহায্য করার ক্ষমতাও মানুষের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এই বৈশিষ্ট্যগুলির বিকাশের সঙ্গে ঘুমের পরিবর্তনেরও যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। আধুনিক মানুষ সাধারণত রাতে প্রায় সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমোয়। শিকার ও বিভিন্ন খাদ্যাদি সংগ্রহ করে জীবনধারণ করা জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ঘুমের সময় কিছুটা বেশি হলেও তাদের ঘুমের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। অন্যদিকে, একটি শিম্পাঞ্জির দিনে প্রায় সাড়ে ন’ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। কিছু নিশাচর বানরের ঘুমের সময় আবার দিনে ১৭ ঘণ্টাও ছাড়িয়ে যেতে পারে। শুধু কতক্ষণ ঘুমোনো হচ্ছে, তা নয়; ঘুমের গভীরতার পরিমাপও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের ঘুমের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সময় কাটে REM বা দ্রুত চোখের নড়াচড়ার পর্যায়ে। অন্যান্য স্তন্যপায়ীর ক্ষেত্রে এই অংশ তুলনামূলক ভাবে বেশ কম। এই পর্যায়ের ঘুম স্মৃতি তৈরি, শেখা এবং মস্তিষ্কের নানা কাজের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। স্যামসনের গবেষণা বলছে, প্রায় এক লক্ষ বছর আগে মানুষ গাছের বদলে মাটিতে রাত কাটানো শুরু করে। মাটিতে ঘুমানোর ঝুঁকি ছিল খানিক বেশি। হিংস্র প্রাণীর আক্রমণ থেকে বাঁচতে তাই দলবদ্ধ ভাবে থাকার অভ্যাস তৈরি করে মানুষ। দলের কিছু সদস্য বিশ্রাম নিত, অন্যরা তখন পাহারায় থাকত। ফলে নিরাপত্তা বাড়ায় কম সময়ে ঘুমিয়েও মানুষ বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগটুকু পেয়ে যেত। এর পরে আগুনের ব্যবহার মানুষের রাতের জীবনকে আরও পরিবর্তন করে। আগুনের আলোয় অন্ধকার দূর হওয়ার পাশাপাশি হিংস্র প্রাণীর ভয়ও তখন কিছুটা হ্রাস পায়। ঠান্ডার হাত থেকেও সুরক্ষা মিলত সেসময়। আগুনকে ঘিরে মানুষ গল্পগুজব করতে শুরু করে, নিজেদের অভিজ্ঞতা একে অপরের সাথে ভাগ করে নেয়। এর ফলে সামাজিক সম্পর্ক ক্রমশঃ আরও শক্তিশালী হয়।

ভাষা ও চিন্তাভাবনার বিকাশেও এর বিপুল প্রভাব পড়ে বলে গবেষকদের ধারণা। রাতের অতিরিক্ত জেগে থাকার সময় মানুষ ধীরে ধীরে অন্যান্য কাজে ব্যবহার করতে শুরু করে। অস্ত্র তৈরি, শিকারের নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন এবং বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। অন্য অনেক প্রাণী যেখানে দিনের সময়টুকুই সক্রিয় থাকে, মানুষ সেখানে রাতকেও কাজে লাগাতে সক্ষম হয়। অর্থাৎ, মানুষের সাফল্যের পেছনে শুধু বড় মস্তিষ্ক বা দলবদ্ধ ভাবে থাকার ক্ষমতাই নয়, ঘুমের বিবর্তনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই মত ডেভিড স্যামসনের। তাঁর মতে, কম সময় ঘুমিয়ে কিন্তু তুলনামূলক গভীর ঘুমের মাধ্যমে মানুষ যেভাবে নিজের শরীরকে বিশ্রাম দেওয়ার পদ্ধতি শিখেছে, তেমনই জেগে থাকার অতিরিক্ত সময় কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে নিজের বুদ্ধি, সামাজিকতা এবং দক্ষতার বিপুল বিকাশ ঘটানো সম্ভব হয়েছে। আর সেই দীর্ঘ বিবর্তনের ফলেই আজ পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি পরিবেশে মানুষের একছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

×
  • CTVN