Calcutta Television Network

প্রাচীন কলিকাতা ও কালীঘাট যেন কলকাতার দীর্ঘ ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল

প্রাচীন কলিকাতা ও কালীঘাট যেন কলকাতার দীর্ঘ ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল
8 October 2026 • 05:21:14 pm

কালীঘাট। শক্তিপীঠ। বাঙালির আদ্যন্ত আধ্যাত্মিক আশ্রয়। বহু ভক্তের পা পড়ে প্রত্যহ। কিন্তু এর ইতিহাস ২০০ বছরের। পঞ্চদশ শতকের মানসর ভাসনের রচনাতেও এই শক্তিপীঠের উল্লেখ পাওয়া যায়। সপ্তদশ শতকের কবি কঙ্কন চণ্ডীতেও উদ্ধৃত রয়েছে এই শক্তিপীঠের কথা। তৎকালীন সময় থেকেই জুড়ে রয়েছে বহু শতকের ইতিহাস, কিংবদন্তি এবং ধর্মীয় বিশ্বাস। আজ যে কালীঘাটকে আমরা চিনি, তার বর্তমান কাঠামো হয়তো খুব একটা প্রাচীন নয়। কিন্তু এই পীঠস্থান যে বহু শতাব্দী ধরে মানুষের বিশ্বাস ও উপাসনার কেন্দ্র, তার ইঙ্গিত মেলে ইতিহাসের নানা সূত্রে। কালীঘাটের প্রাচীনত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয় গুপ্ত সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের মুদ্রাকে। বঙ্গকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার সঙ্গে যে শাসকের নাম জড়িয়ে রয়েছে, সেই দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের মাত্র দুই ধরনের মুদ্রা এখনও পর্যন্ত বাংলা থেকে উদ্ধার করা গিয়েছে। তাঁর ধনুর্ধর ধরনের একটি মুদ্রা কালীঘাটে আবিষ্কৃত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রথম কুমারগুপ্তের পর গুপ্ত শাসকদের মধ্যে এই ধরনের মুদ্রাই ক্রমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কালীঘাট থেকে এমন মুদ্রার সন্ধান পাওয়ায় এই এলাকার প্রাচীনত্ব নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়তে দেখা যায়।

তবে তৎকালীন কালীঘাট আর আজকের কালীঘাট কিন্তু এক ছিল না। কথিত আছে, মূল মন্দির ছিল অত্যন্ত ক্ষুদ্র, একটি অতীব সাধারণ কুঁড়েঘরের মতো। ষোড়শ শতকের গোড়ার দিকে রাজা মানসিংহ সেখানে একটি ছোট মন্দির নির্মাণ করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই কাঠামোও ক্রমে বদলেছে। বর্তমান কালীঘাট মন্দিরের নির্মাণের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বড়িশার শাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারের নাম। তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত বর্তমান মন্দিরের কাজ ১৮০৯ সালে সম্পূর্ণ হয়। তবে মন্দিরের সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে পরবর্তী সময়ে তৈরি হয় সমূহ বিতর্ক। হালদার পরিবার নিজেদের মন্দিরের সম্পত্তির মূল মালিক বলে দাবি করে। সেই দাবিতে আপত্তি জানায় বড়িশার চৌধুরী পরিবার। বিতর্কের অবসান ঘটাতে শেষ পর্যন্ত প্রশাসনকে সক্রিয় হতে হয়। বিংশ শতকের ষাটের দশকে সরকার এবং হালদার পরিবারের প্রতিনিধিদের নিয়ে মন্দির পরিচালনার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। মন্দিরের নিত্যপূজা ও ধর্মীয় আচার পরিচালনার দায়িত্ব থাকে হালদার পরিবার এবং তাঁদের উত্তরাধিকারীদের হাতে। মন্দিরের এই সেবাদায়িত্ব পালনকারীরাই পরিচিত আজকের ‘সেবায়েত’ নামে। কালীঘাটের ইতিহাস যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনই এখানকার দেবী কালীর রূপও অনন্য। এই মন্দিরের বর্তমান কালীপ্রতিমা পরশপাথরে নির্মিত। কথিত আছে, দুই সাধক, ব্রহ্মানন্দ গিরি এবং আত্মারাম গিরি এই প্রতিমা নির্মাণ করেছিলেন। দেবীর তিনটি বিশাল চোখ, সোনার তৈরি দীর্ঘ প্রসারিত জিহ্বা এবং চারটি হাত, সব মিলিয়ে তাঁর স্বতন্ত্র রূপ। দেবীর দুই হস্তে বিরাজমান তলোয়ার এবং একটি ছিন্ন মস্তক। এই দুই প্রতীকের মধ্যেও রয়েছে গভীর দার্শনিক তত্ত্ব। তলোয়ারকে ধরা হয় দিব্য জ্ঞানের প্রতীক হিসেবে। আর ছিন্ন মস্তক প্রতীক মানব অহংকারের। অর্থাৎ মোক্ষের পথে এগোতে হলে দিব্য জ্ঞানের সাহায্যে মানুষের অহংকারকে বিনাশ করতে হবে। বাকি দুই হাত অভয় ও বরদা মুদ্রায়। এক হাতে ভয়হীনতার আশ্বাস, অন্য হাতে বরদানের প্রতীক। বিশ্বাস অনুযায়ী, সত্য হৃদয়ে যাঁরা দেবীর কাছে আরাধনা করেন, তাঁদের তিনি ইহকাল ও পরকালে পথ দেখান এবং মুক্তির পথে নিয়ে যান। তাই এই সবকিছু মিলিয়ে কালীঘাট যেন কলকাতার দীর্ঘ ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। প্রাচীন কলিকাতা ও কালীকথা আবহমান কাল সমান্তরাল পথ হাঁটিয়াছে।