ঝাড়খণ্ডের ঝরিয়া রাজবাড়ির দুর্গাপুজো। এ যেন শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে সাড়ে তিনশো বছরের প্রাচীন ইতিহাস, লোককথা এবং রাজপরিবারের নানা পুরাতন রীতি। সময় বদলেছে, বদলেছে পুজোর নানা নিয়মও। কিন্তু এখনও নিজের ঐতিহ্য ধরে রেখেই শারদোৎসবের আয়োজন করে চলেছে ঝরিয়া রাজবংশ। এক সময় ঝাড়খণ্ডের ওই অঞ্চলে ছিল এক অত্যাচারী সর্দার। যার দাপটে সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে উঠেছিল দুর্বিসহ। তাঁর হাত থেকে মুক্তি পেতে মানুষ দেবীর কাছে প্রতিনিয়ত প্রার্থনা করতেন। সেই সময় ভ্রমণ করতে করতে সেখানে পৌঁছন রাজপুত যুবক সংগ্রাম সিংহ। মানুষের দুর্দশা দেখে তিনি আহত হন, অত্যাচারী সর্দারের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ে নামেন।
দু’জনের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এক পর্যায়ে সর্দার নিহত হলেও বিপত্তি দেখা দেয় অন্যত্র। আদিম লোককথা অনুযায়ী, সর্দার ছিলেন দেবীর উপাসক। তাঁর হাতে থাকা অস্ত্র কিছুতেই মাটিতে ভূপতিত হচ্ছিলো না। সংগ্রাম সিংহ যতই চেষ্টা করুন, তরবারি তাঁর হাত থেকে নামানো সম্ভব হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত তিনি দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করেন। তাঁর ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে দেবী আবির্ভূত হন। তাঁকে শরৎকালে নিজের পুজো করার নির্দেশও দেন মা। দেবীর নির্দেশ মেনে সংগ্রাম সিংহ তাঁকে পোয়া বা চালের তৈরি বিশেষ ভোগ নিবেদন করেন। এরপরই তাঁর হাত থেকে নেমে আসে রক্তাক্ত তরবারি। এই ঘটনাকেই ঝরিয়া রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর সূচনার আলোকে নতুন করে দেখা যেতে পারে। যদিও প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে সংগ্রাম সিংহের হাত ধরেই ঝরিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠা হয়। তার পর থেকেই রাজপরিবারের উদ্যোগে প্রতিবছর নিয়ম করে দুর্গাপুজো হয়ে আসছে। আজও কালিকাপুরাণে বর্ণিত প্রাচীন পদ্ধতি মেনেই এই পুজোর বেশ কিছু আচার অনুষ্ঠান পালন করা হয়। ঝরিয়া রাজবাড়ির পুজোর অন্যতম আকর্ষণ সপ্তমীর ভোর। সূর্য ওঠার আগেই রাজপরিবারের বধূরা সরোবরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। সঙ্গে থাকে নবপত্রিকা। বিশেষ নিয়ম মেনে পুজো করে সেটিকে স্নান করানোর পর শুরু হয় পরবর্তী আচার। এর পর পরিবারের সদস্যরা যান একটি পুরনো কুঠুরি ঘরে। সেখানে রক্ষিত রয়েছে রাজপরিবারের প্রাচীন তরবারি এবং কুলদেবীর বিগ্রহ। দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে দেবীর পাশাপাশি এই দুই প্রতীকেরও নিয়ম মেনে আরাধনা করা হয়।
পুজোর সময় খুলে দেওয়া হয় আরও একটি বিশেষ ঘর, ‘সীতাঘর’। প্রায় সাড়ে চারশো বছরের পুরনো এই ঘরটি বছরের বাকি সময় নাকি বন্ধই রাখা হয়। রাজবাড়ির অন্যান্য স্থাপত্য যেখানে ইট-পাথরের তৈরি, সেখানে সীতাঘরের গড়ন সম্পূর্ণ আলাদা। মাটি এবং খড় দিয়ে তৈরি এই ছোট্ট ঘরটিকে অত্যন্ত যত্নে সংরক্ষণ করা হয়। এই পুজোর আরও একটি বিশেষ রীতি হল দেবীর ভোগ। রাজপরিবারের একজন কুলবধূ নিজের হাতে চাল দিয়ে পোয়া রান্না করে দেবীকে ভোগ নিবেদন করেন। প্রাচীন এই প্রথা আজও বজায় রয়েছে। এক সময় নবমীর দিনে মায়ের উদ্দেশ্যে একশোরও বেশি ছাগ বলির রীতি ছিল। সময়ের বিবর্তনের সেই সংখ্যা অনেকটাই নিম্নগামী। তবে আচার বদলালেও পুজোকে ঘিরে রাজপরিবারের আবেগ ও মানুষের উৎসাহে কিন্তু ভাটা পড়েনি। দশমীতে রাজবাড়ির নিজস্ব সরোবরেই প্রতিমার নিরঞ্জন হয়। লোককথা, রাজবংশের ইতিহাস এবং প্রাচীন আচার, সবটুকু মিলিয়ে ঝরিয়া রাজবাড়ির দুর্গাপুজো আজও ঝাড়খণ্ডের এক অনন্য ঐতিহ্য হয়ে ইতিহাসের বুকে জ্বাজল্যমান।