Calcutta Television Network

কৌশিকী অমাবস্যায় কেন পুজো হয় দেবীর? জানুন এর পেছনের পৌরাণিক কাহিনি

কৌশিকী অমাবস্যায় কেন পুজো হয় দেবীর? জানুন এর পেছনের পৌরাণিক কাহিনি

10 September 2026 , 12:18:27 pm

‘কালী করালি মনজবা চ ধুমরাক্ষী স্ফুলিঙ্গিনী লোলজিহ্বা’, বেদে কালী প্রসঙ্গের উল্লেখ খানিক এভাবেই এসেছে। হোমের প্রজ্জ্বলিত শিখাকে তৎকালীন ভারতবর্ষে কালী নামে ডাকা হত। যে শিখার তলায় পড়ে থাকতো সাদা ছাইয়ের স্তুপ। তন্ত্রের প্রভাব ছিল হিন্দুধর্মে প্রবলভাবে। শিখাকে কল্পনা করা হত উলঙ্গ দেবী রূপে, শিবরূপে বিরাজমান ছাইভস্ম। শোনা যায় প্রাথমিকভাবে কালীর নাকি দুটি হাত ছিল। পরবর্তীতে বিষ্ণুশর্মা পঞ্চতন্ত্র লিখলেন, নব কলেবর দিলেন কালীকে। যদিও তিনি তখন ঠাট্টাই ছুঁড়ে দিয়েছিলেন দেবী কালীকে। খানিক বিষ্ণুর সাথে সাদৃশ্য রেখেই চারটি হাত প্রদান করেন তাঁর কল্পনায়। অন্যদিকে মহাভারতেও উল্লেখ রয়েছে কালীর। রাজা শান্তনু মুগ্ধ হন যে কন্যাকে দেখে, দেবব্রত থেকে গেলেন অবিবাহিতই, তাঁর আসল নাম কিন্তু ছিল কালী। যদিও সে কথা বেমালুম ভুলে গেল ইতিহাস। স্মরণে রাখলো রাজার সাথে চার হাত এক হওয়ার পরবর্তী নাম সত্যবতী। যুক্তি কী? রাজার বৌয়ের নাম কালী নাকি ঈষৎ ‘বেমানান’। এভাবে কালীকে দেবীরূপে গ্রহণের অনাগ্রহ বহুদিনের। 

তবে কৌশিকী অমাবস্যার ইতিহাস খানিক অন্যরকম। কালী কি কৌশিকী? নাকি কৌশিকী আসলে পার্বতীরই শরীর থেকে জন্ম নেওয়া এক স্বতন্ত্র শক্তিরূপ? পুরাণের পাতায় এই প্রশ্নের উত্তর একেবারে জলবৎ তরলং কিন্তু নয়। বরং কৌশিকী দেবীকে ঘিরে রয়েছে অন্তত দু’টি আকর্ষণীয় থিওরি। দুটি কাহিনির পথ খানিক আলাদা। তবে দু’টিরই কেন্দ্রে রয়েছে দেবীর শক্তি, রূপান্তর এবং অসুরবিনাশের আখ্যান। পৌরাণিক সূত্র ধরে শোনা যায় শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের কাহিনি। মহিষাসুরকে বধ করার পরে দেবতারা আরাধনা করতেন দেবীর, স্তুতি করতেন। আর সেই স্তুতির পরেই ঘটে কিছু অলৌকিক ঘটনা। দেবী যেন নিজের শরীর থেকে একটি কোষ ত্যাগ করে দেন। সেই কোষ থেকেই জন্ম হয় দেবী কৌশিকীর। ‘শরীরকোষতশ্চাস্যা সমদ্ভূতাভবচ্ছিবা’, এর অর্থ দেবীর শরীরের কোষ থেকে যাঁর আবির্ভাব। আবার শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে, ‘শরীরকোষাৎ যৎতস্যাঃ পার্বত্যা নিসৃতাম্বিকা’। পার্বতীর শরীরের কোষ থেকে অম্বিকার জন্ম, আর সেই কারণেই তিনি পরিচিত হন ‘কৌশিকী’ নামে।  কিন্তু প্রশ্ন হল, দেবীর নিজের শরীর থেকেই কেন আর এক দেবীর জন্ম প্রয়োজন হল? এর কাহিনী লুকিয়ে রয়েছে শুম্ভ-নিশুম্ভের পাওয়া বরে। পুরাণের দীর্ঘ তত্ত্ব অনুধাবন করলে লক্ষ্য করা যায়, তারা এমন বর পেয়েছিল যে কোনও পুরুষের সংস্পর্শে আসা নারী কখনোই তাদের মৃত্যুর কারণ হতে পারবেন না। শিবের অর্ধাঙ্গিনী তখন অম্বিকা। ফলে তাঁকে দিয়ে অসুরদ্বয়ের বধ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজন হল এমন কোনো শক্তির, যিনি কখনোই সংস্পর্শে আসেননি পুরুষের। দেবী নিজের দেহকোষ ত্যাগ করলেন, আর সেই কোষ থেকেই জন্ম নিলেন কৌশিকী। পরবর্তী সময়ে তিনিই শুম্ভ-নিশুম্ভের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদের বিনাশসাধন করেন।

তবে এর মধ্যে আরও কিছু নিগুড় তাৎপর্য খুঁজে পান কেউ কেউ। অম্বা বা অম্বিকা দেবীর মাতৃরূপ মূলত সৌন্দর্য, মমতা ও স্নেহের প্রতীক। সেই কোমল মাতৃরূপের হাতে অসুরবধের রক্তক্ষয়ী দায়িত্ব সরাসরি দেওয়া থেকে বিরত রাখা হল, সেই গুরুদায়িত্বের অধিকারিণী হলেন, তারই অন্তর থেকে জন্ম নেওয়া এক তীব্রতর শক্তি। কৌশিকী তাই কোমলতার আড়ালে থাকা সংহারী শক্তির প্রকাশ। এই কারণেই কৌশিকী কালীর সঙ্গেও একাত্ম।  কৌশিকীর বর্ণও কৃষ্ণকায়। গৌরী হয়ে উঠলেন পার্বতী, অন্যদিকে তাঁর পুরাতন কৃষ্ণবর্ণ কোষ থেকেই প্রকাশ পেলেন কৌশিকী। অর্থাৎ একই দেবীর দুই ভিন্ন শক্তির আধার।

তবে অমাবস্যার রাতেই কেন কালী বা কৌশিকীর আরাধনা হয় আজও? এর উত্তর রয়েছে শক্তির সঙ্গে সংহারের যোগে। কালীপূজা কেবল দেবীর আরাধনা নয়, এটি শক্তির আরাধনা। যে শক্তির একদিকে সৃষ্টিশীল, অন্যদিকে প্রবল সংহারী। অমাবস্যার ঘন অন্ধকারে মিশে তৈরী হয়েছে যার তামসিক গড়ন। তাই প্রবল অন্ধকার রাতেই শক্তিরূপে দেবীর আরাধনা। বাংলার ইতিহাসে তাই এই দ্বৈতবাদ ঘুরে ঘুরে এসেছে বারবার। সমৃদ্ধ করেছে সংস্কৃতিকে।

0 0 0

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে সমর্থন করেন?

Note:"আপনার তথ্যের গোপনীয়তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী কথোপকথন এবং এখানে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ বা প্রকাশ করা হবে না"
×
  • CTVN