Calcutta Television Network

দেবীর মহাস্নানে কোন রাগ বাজত? হারিয়ে যাওয়া দুর্গাপুজোর সুরের গল্প

দেবীর মহাস্নানে কোন রাগ বাজত? হারিয়ে যাওয়া দুর্গাপুজোর সুরের গল্প

10 September 2026 , 04:24:02 pm

আট কলস জল। আটটি রাগ। আট রকম বাদ্য। আজকের দুর্গাপুজোর মণ্ডপের সাথে দূরত্ব বহু যোজনের। আজ মণ্ডপে দাঁড়িয়ে এ কথা বললে হয়তো অনেকেই বিস্মিত হবেন। অথচ একসময় দেবী দুর্গার মহাস্নান পর্ব ছিল এমনই সুরালাপে ছন্দিত। নির্দিষ্ট রাগে আলাপ, তার সঙ্গে নির্দিষ্ট বাদ্য, তারপর আট কলসের জল দিয়ে দেবীস্নান। এখন নেই সেই দীর্ঘ আচার। আট রাগের জায়গা কেড়েছে শুধু একটানা ঘণ্টাধ্বনি। কিন্তু এই সুর হারিয়ে যাওয়ার গল্পের শুরু বহু পূর্বে।

দেবীভাগবতে শরৎ ও বসন্ত, দুই ঋতুতেই দেবীর আরাধনার বিধানের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে দেবী নিজেই এই দুই ঋতুকে ‘যমদংষ্ট্রা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ, ঋতু পরিবর্তনের এই সময় নানা রোগে মানুষের মৃত্যু ছিল অবধারিত। তাই মহামারির হাত থেকে রক্ষা পেতে চৈত্র ও আশ্বিনে দেবীর ব্রত পালনের উল্লেখ রয়েছে। চণ্ডীর দ্বাদশ অধ্যায়েও মেধাঋষি জানিয়েছেন, দেবী আবির্ভূত হন মহামারিরূপেও। অর্থাৎ দুর্গাপুজো শুধু উৎসব নয়, মানুষের ভয়, অসুখ আর অনিশ্চয়তার সঙ্গেও তার যোগ বহু প্রাচীন। সময় গড়িয়েছে। পুজোর নিয়মকানুনও হয়েছে আরও পরিমিত। গৌড়বঙ্গের স্মৃতিকারদের মধ্যে জিকন ও বালকের নাম পাওয়া যায় প্রাচীনতমদের তালিকায়। সেন রাজত্বের পর দ্বাদশ থেকে ষোড়শ শতক পর্যন্ত বাংলায় স্মৃতিনিবন্ধ রচনার প্রসার ঘটে বহু জায়গায়। পঞ্চদশ শতকের  অন্তিম লগ্নে আচার্য শূলপাণি তাঁর ‘দুর্গোৎসব-বিবেক’-এ দুর্গাপুজোর নানা বিধি লিপিবদ্ধ করে যান। পরে নবদ্বীপের নৈয়ায়িক ভট্ট রঘুনন্দনের ‘অষ্টাবিংশতি তত্ত্ব’ জনপ্রিয় হয়ে উঠলে শূলপাণির পুঁথির পঠন-পাঠন অনেকটাই খোয়া যায়। তবু সেই পুরনো বিধির একটি অংশ কিন্তু ফিরে এসেছিল বেলুড় মঠে। তখন ১৯০১ সাল, দুর্গাপুজো করার কথা চিন্তা করছেন স্বামী বিবেকানন্দ। তার আগে তিনি খুঁজছেন রঘুনন্দনের ‘অষ্টাবিংশতি তত্ত্ব’। কারণ, মঠে কীভাবে দুর্গোৎসব করতে হবে, তার বিধি সন্ধান আবশ্যক। স্বামীজির শিষ্য শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী পরে লিখেছেন সেই ঘটনার বিষয়ে। আর সেই পুঁথির পাতাতেই লুকিয়ে ছিল এক অভূতপূর্ব সুরের জগৎ। দুর্গার মহাস্নান কোনও নিছক জল ঢালার আচারে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রথমে পঞ্চগব্য ও পঞ্চামৃত। তারপর বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত মাটি মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে দেবীর অঙ্গে তার নিবেদন। মৃত্তিকা-স্নানের পর সূচনা হত অষ্টকলস স্নানের। আর সেই আট কলসের জন্য ছিল আট রাগ, আট বাদ্য, আট ধরনের জল এবং আটটি মন্ত্র। ভাবুন, একটি প্রাচীন দুর্গামণ্ডপ। পুরোহিত বজ্র কণ্ঠে মন্ত্র উচ্চারণ করছেন। একদিকে কলসের জল, অন্যদিকে একের পর এক রাগের আলাপ। প্রতিটি রাগের সঙ্গে বদল ঘটছে বাদ্যেরও। শেষ কলসটির সঙ্গে ধানেশ্রী রাগের যোগটিও এক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। ‘ধান’ ও ‘শ্রী’—নামটির মধ্যেই যেন শস্য ও সমৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। দুর্গাপুজোর নবপত্রিকায় শেকড়-সহ ধানগাছের উপস্থিতিও সেই ভাবনাকে করে তোলে আরও অর্থবহ। দশমীতে নবপত্রিকার বিসর্জন হলেও ধানগাছগুলি ঘরে ফিরিয়ে আনার রীতি প্রচলিত। যেন দেবীর সঙ্গে ঘরে ফিরে আসে শস্য, সমৃদ্ধি ও জীবনের আশীর্বাদ।

আর ধানেশ্রীর সঙ্গে কেন ভৈরববাদ্য?

সম্ভবত এখানেও রয়েছে এক প্রতীকী মিলনের ছবি। ভৈরব শিবের প্রকাশ, দুর্গা শক্তির। অর্থাৎ শেষ কলসে সুর ও বাদ্যের একে যুগলবন্দি যেন শিব ও শক্তির মিলনেরই এক সঙ্গীতময় প্রতীক হয়ে ওঠে। এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে, আটই কেন? উত্তরটিও পাওয়া যায় অষ্টম কলসের মন্ত্রে—‘অষ্ট মঙ্গল সংযুক্তে দুর্গে দেবি নমোঽস্তুতে।’ অষ্টমঙ্গলার উল্লেখ কিন্তু রয়েছে মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যেও অর্থাৎ আট সংখ্যাটিও এক্ষেত্রে নিছক কাকতালীয় ছিল না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল পুজোর সেই সুরের আচার। রঘুনন্দন নিজেই মৎস্যপুরাণের সূত্র মেনে লিখে গেছিলেন, সব বাদ্য জোগাড় সম্ভব না হলেও অন্তত ঘণ্টাটুকু বাজালেও চলবে। সম্ভবত সেই সহজ বিকল্পই ধীরে ধীরে হয়ে উঠল মূল রীতি। আট রাগ, আট বাদ্য সরে গেল দেবী আরাধনার মণ্ডপ থেকে। রয়ে গেল শুধু পুঁথির পাতায় তাদের নামগুলি। আর সেই রাগগুলির কয়েকটির অবস্থাও আজ করুণ। মালব, বরাটী ও ধানেশ্রী, এই তিন রাগ যা ছিল দুর্গার মহাস্নানের সঙ্গে যুক্ত, তা আজ প্রায় বিস্মৃত। মালবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাচীন মালব জাতির স্মৃতিকথা। বরাটীকে কেউ কেউ মহাভারতের বিরাট দেশের সঙ্গে সাদৃশ্য টেনেছেন; বিভিন্ন সঙ্গীতশাস্ত্রে তার ভিন্ন নামও পাওয়া যায়। আর ধানেশ্রী, যার নামেই আছে শ্রী ও ধান, শস্য ও সমৃদ্ধির এক প্রাচীন প্রতীকী চয়ন। একসময় বাংলার সঙ্গে পশ্চিম ভারতের একই রাগের পরিবেশনেও ছিল বিপুল ফারাক। বিভাস, ললিত, বসন্ত, প্রতিটি রাগেরই অঞ্চলভেদে ছিল আলাদা রূপ। ফলে আজকের সবচেয়ে বড় রহস্যটি হয়তো এটাই,  দুর্গার মহাস্নানের সময় সেই রাগগুলি আসলে বাজত কিভাবে? কী ছিল তাদের নিজস্ব সুর? কেমন ছিল সেই আট কলসের জল পড়ার ধীর শব্দের সঙ্গে মিশে যাওয়া শ্রুতিমধুর আলাপ? কোন বাদ্য বেজে উঠত সঙ্গতে? কেমন ছিল সেই পুরাতন পুজোমণ্ডপের আবহ? উত্তর হয়তো আর কোনওদিন জানা যাবে না।

0 0 0

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আপনি কোন দলকে সমর্থন করেন?

Note:"আপনার তথ্যের গোপনীয়তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী কথোপকথন এবং এখানে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ বা প্রকাশ করা হবে না"
×
  • CTVN