দোলযাত্রা শুধু রঙের উৎসব নয়, এর শিকড় প্রোথিত প্রাচীন পুরাণ, লোকাচার ও সামাজিক ইতিহাসে। ফাল্গুনের চতুর্দশীর রাতে চাঁচড়, মেড়াপোড়া বা নেড়াপোড়ার মধ্য দিয়ে দোলের সূচনা হয়। পদ্মপুরাণ-এ উল্লেখ আছে- কলিযুগে হিন্দুদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব দোল। আবার স্কন্দপুরাণ-এর উৎকল খণ্ডে দোল খেলার বিধি-বিধান বিস্তারিতভাবে বর্ণিত।
পুরাণকথায় শোনা যায়, রাজর্ষি ইন্দ্রদ্যুম্ন প্রথম রাধাকৃষ্ণের দোলমঞ্চ নির্মাণ করে দোল উৎসবের প্রচলন করেন। তবে ইতিহাসের কাছাকাছি সময়ে এ উৎসবের রূপ কেমন ছিল, তার আভাস মেলে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী-র উপন্যাস বেনের মেয়ে-তে। তিনি লিখেছেন, সপ্তগ্রাম অঞ্চলে সারি সারি ‘মেড়া অসুর’ সাজিয়ে সন্ধ্যায় আগুন জ্বালানো হত। শিশু-কিশোরেরা উল্লাসে নাচত, গাইত- আগুনের লেলিহান শিখায় অশুভের দহন ঘটত।
অধ্যাপক নির্মল বসু তাঁর ভারতকোষ-এ উল্লেখ করেন, ওড়িশায় এই প্রথা ‘মেনটা পোড়াই’ নামে পরিচিত। অতীতে জীবন্ত ভেড়া পোড়ানোর নির্মম রীতিও ছিল, যদিও এখন তা প্রতীকী আচারেই সীমাবদ্ধ। এমনকি কামসূত্র-তেও দোলকে দোলায় বসে আমোদ-প্রমোদের উৎসব ও মেড়া পোড়া দর্শনের কথা বলা হয়েছে।
দোলের রঙ খেলার বর্ণনাও অনন্য। মাটির পাত্রে প্রাকৃতিক ফাগ তৈরি হত- তাতে বিষাক্ত কিছু থাকত না। বুড়ো-নাতি, ছেলে-মেয়ে সবাই মিলেমিশে রঙে রঙিন হয়ে উঠত। সামাজিক ভেদাভেদ ভুলে একদিনের জন্য তৈরি হত এক সাম্যভিত্তিক আনন্দলোক।
কলকাতার বাবুসমাজে দোলের চেহারা ছিল আলাদা। হুতোম প্যাঁচা-র রম্যরচনায় তার খানিক উল্লেখ আছে। আবার জব চার্ণক-এর আগমনের বহু আগে থেকেই লালদিঘি অঞ্চলে দোল খেলা হত। কলিকাতার ইতিবৃত্ত-এ প্রাণকৃষ্ণ দত্ত জানান, লালদিঘির উত্তর ও দক্ষিণ কোণে রাধা-গোবিন্দের দোলমঞ্চ ছিল। সখীবেশে আবির যুদ্ধ চলত, দিঘির জল লাল হয়ে উঠত- সেখান থেকেই ‘লালদিঘি’ ও ‘লালবাজার’ নামের উৎপত্তি। শোনা যায়, কিছু ইংরেজ সাহেব আবির খেলায় যোগ দিলে মারও খেতে হয়েছিল! পরে চার্ণক এই খেলা বন্ধ করেন।